দেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সারা দেশে হত্যা মামলা হয়েছে ২ হাজার ৯১১—গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১১টি। অর্থাৎ এ বছর গত এক দশকের মধ্যে দৈনিক গড়ে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পুরনো কিছু হত্যা মামলা এ বছর রেকর্ড হওয়ায় মোট মামলার সংখ্যা বেড়েছে। তবে এ ব্যাখ্যার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বাস্তব চিত্রকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কেবল হত্যাকাণ্ড নয়, দেশের সর্বত্র ছিনতাই, ডাকাতি, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সহিংসতার মতো অপরাধ যে বেড়েছে সেটি বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে শুরু করে একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে অপরাধের মাত্রা বেড়ে গেলে সরকারের পক্ষ থেকে বলতে শোনা গেছে যে অভ্যুত্থানের পর অপরাধপ্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। আবার সে সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষত পুলিশ জনগণের রোষানলে পড়ে। যে কারণে মাঠ পর্যায়ে তাদের উপস্থিতিও সেভাবে ছিল না। সব মিলিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনমন ঘটে। কিন্তু অভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও এ পরিস্থিতির উন্নয়ন না ঘটা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের একপ্রকার ব্যর্থতাই বলা যায়। পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দাপ্তরিক কাজে সক্রিয় করতে পারলেও সরকার এখনো তাদের মাঠ পর্যায়ে অপরাধ দমনে পুরোপুরি সক্রিয় করা যায়নি।

আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে অভ্যুত্থানের পর থেকে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো মব সন্ত্রাস। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত দেশে অন্তত ৩৯০টি মবের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১৯২ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে; আহত হয়েছে আরো কমপক্ষে ৩৭৬ জন। মব সন্ত্রাসের বাইরে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সহিংসতায় মৃতের সংখ্যাও নেহাতই কম নয়। কেবল গত সেপ্টেম্বরে সারা দেশে ৩৭টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব ঘটনায় নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ২৬৮ জন। অথচ গত আগস্টেও রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা কম ছিল, চারজন। এছাড়া এ সময় গণপিটুনিতে ২৪ জন নিহত ও ২১ জন আহত হয়েছে। সংগঠনটির ভাষ্যমতে, গত মাসে সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল হতাশাজনক। মব সন্ত্রাস, গণপিটুনিতে নির্যাতন ও হত্যা, শ্রমিকদের ওপর হামলা, পাহাড়ে সহিংসতা, মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাংচুর, মাজারে হামলা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে।

অন্যদিকে ডিএমপির তথ্যমতে, গত জানুয়ারি থেকে মে—পাঁচ মাসে রাজধানীতে ১৬৮টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে ১০২টিই অরাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হয়েছে, যা ঢাকার মোট হত্যা মামলার ৬১ শতাংশ। গড় হিসাব করলে প্রতি মাসে ঢাকায় অরাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ২০ জনেরও বেশি। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৩০টি, যার মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৬৬টি। এর মধ্যে ২২টিই হলো ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা।

যদিও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং গত জুলাইয়ে এক ‍বিবৃতিতে জানায় যে চলতি বছর বড় ধরনের অপরাধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—এমন দাবি সঠিক নয়। তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশ সদর দপ্তর মামলার হিসাব দিয়ে অপরাধ পরিসংখ্যান তৈরি করে বলে সবসময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় না। পুলিশ মামলা নিতে অনীহা দেখালে পরিসংখ্যানেও অপরাধ কম দেখায়। এ পরিসংখ্যান থেকে সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাছাড়া মব সন্ত্রাস, রাজনৈতিক সহিংসতা, খুন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো ব্যাপকভাবে সামনে আসছে, আলোচিত হচ্ছে। এগুলো বড় ধরনের অপরাধ বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত। তাদের মতে, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি সময়ে সমাজে যে ভয় ও অনিশ্চয়তার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ। বিচারের নিশ্চয়তা না থাকলে অপরাধ বাড়বেই। আর দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিদ্যমান। অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়ে নিরাপদ থাকে, আর সাধারণ মানুষ ভয় পায় মামলা করতে কিংবা সাক্ষ্য দিতে। উপরন্তু মাঠপর্যায়ের পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা নেই। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ওপর ব্যাপক জনরোষ ও হামলার পর তাদের মনোবল ও কর্মক্ষমতায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। সে সময় অন্তত ৪৪ পুলিশ সদস্য নিহত হন, পুড়িয়ে দেয়া হয় একাধিক থানা। কয়েক দিন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে পুলিশের কার্যক্রম। সেনাবাহিনীর সহায়তায় পরে তারা দায়িত্বে ফিরলেও মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা অনেক কমে যায়। অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও অপরাধীরা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে যাচ্ছে। ফলে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

অপরাধ দমন শুধু তদন্ত বা মামলা দায়েরের বিষয় নয়, এটি প্রতিরোধেরও বিষয়। এজন্য মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে, স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নজরদারি গড়ে তুলতে হবে। সম্প্রদায়ভিত্তিক পুলিশিং কার্যকর করতে হবে। বিশেষত পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের মাধ্যমে কৌশলগত পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন গড়ে ৮-১০টি খুনের ঘটনা ঘটছে। এটিই প্রমাণ করে দেশে আইনের অনুশাসন বাস্তবায়ন হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাঠপর্যায়ে আরো সক্রিয়, দৃশ্যমান ও জনগণের আস্থাভাজন হতে হবে। অপরাধ বিশ্লেষণ, দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ—এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।