মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা শুল্ক বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ তিন মাসের জন্য স্থগিত করলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্য রফতানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ এখনো কাটেনি। ন্যূনতম ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বহাল থাকায় এক ধরনের অনিশ্চয়তাও আছে। তবে তিন মাস পর কী হবে, সেটি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না এখনো। এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও আছে। এ বিষয়ে সুরাহা করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতাও চালাতে হবে। কেননা বাংলাদেশের রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক থেকে। তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজারও যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে তা নিয়ে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন। মার্কিন শুল্কনীতি এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে বাংলাদেশকে এখনই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া বাংলাদেশের প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক। এ পণ্যই মোট রফতানি অর্থমূল্যের ৮২ শতাংশ। এছাড়া অন্য পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে হেডগিয়ার, জুতা, অন্যান্য বস্ত্রপণ্য, পালক এবং পালক দ্বারা তৈরি সামগ্রী, চামড়াজাত পণ্য, মাছ, শস্যদানা, আসবাব প্রভৃতি।
মার্কিন পাল্টা শুল্ক নিয়ে তিন মাস পর কী হবে তা কারো জানা নেই। তবে তিন মাস পর যদি স্থগিত হওয়া শুল্কনীতি কার্যকর হয়, তাহলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে আঘাত হানবে। এ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের দাম বেড়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের কাছে দাম বেশি হলে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে যেতে পারে। তখন সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। শুল্ক আরোপের কারণে শুধু বাংলাদেশে প্রভাব পড়বে না। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা বেড়ে গেছে, এ কারণে তাদের জিডিপি কমে যাবে। একদিকে তাদের আয় কমবে, অন্যদিকে দাম বাড়বে। মার্কিন ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। এর একটি প্রভাব বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই পড়বে। সাধারণত বাংলাদেশ থেকে যে ধরনের পণ্য যুক্তরাষ্ট্র আমদানি করে, তা কম দামি। কারণ এখানে শ্রমিক খরচ কম। কিন্তু তিন মাস পর এ শুল্কনীতি কার্যকর হলে তখন একই পণ্যের দাম আগের চেয়ে বেড়ে যাবে। আরেকটি বিষয় বলা দরকার, যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা পণ্যের সিংহভাগ জায়গা দখল করে আছে তৈরি পোশাক খাত। ফলে যুক্তরাষ্ট্রর পাল্টা শুল্কনীতি কার্যকর হলে এর প্রভাব বেশি পড়বে পোশাক খাতেই। এখনই রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণ না ঘটাতে পারলে তৈরি পোশাক শিল্পে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। বিদেশী ক্রেতারা বাংলাদেশে এসেছেন সস্তা শ্রম ও মূল্যের জন্য। যেখানে সস্তা পাবে, সেখানেই তারা যাবেন। এটাই তাদের ব্যবসা। পণ্যের দাম বেড়ে গেলে ভোক্তাও বেশি দামে পণ্য কিনবে না। আবার ব্র্যান্ডগুলোও কখনই বেশি টাকায় পণ্য কিনবে না। সুতরাং বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের দাম বেড়ে গেলে মার্কিন বায়াররা বিকল্প খুঁজবে। এক্ষেত্রে তাদের জন্য সম্ভাব্য গন্তব্য হতে পারে কেনিয়া, মিসর কিংবা হন্ডুরাসের মতো দেশগুলো। কারণ ওই দেশগুলোয় শুল্কের হার ১০ শতাংশ এবং ওগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাছেও। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ এ খাত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপের কথাও মাথায় রাখা দরকার। দুই মার্কেটেই একই ঘটনা ঘটলে আমাদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশের এখন স্বল্পমেয়াদি আর দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের করণীয় আছে। দীর্ঘমেয়াদির মধ্যে একটি করণীয় হলো, নির্দিষ্ট কোনো দেশ ও একটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে এবং রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণ করতে হবে। আপাতত দ্রুত দরকষাকষিতে যেতে হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক নিয়ে।
পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালেই স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশের গোষ্ঠীতে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিদেশে পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে নানা সুযোগ-সুবিধা পায়; যেমন শুল্কমুক্ত রফতানি, নানা শর্ত-নমনীয়তা, রফতানি সাহায্য ইত্যাদি। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশের এসব সুযোগ-সুবিধা চলে যাবে। স্বল্পোন্নত দেশের স্তর থেকে উন্নয়নশীল স্তরে উন্নীত হলে বাংলাদেশ অন্যান্য সুযোগও হারাবে—যেমন অনুদান সাহায্য, অত্যন্ত কম সুদহারে ঋণ পাওয়ার সুযোগ, ঋণ ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে শর্তের শিথিলতা, প্রায় শূন্য বা অত্যন্ত কম শুল্কে বিশ্ববাজারে রফতানির সুযোগ ইত্যাদি। এতে অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করছেন যে এমন একটি কাঠামোয় বাংলাদেশের বর্তমান নাজুক অর্থনীতি আরো ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।
এ উত্তরণ কৌশলের পরিপ্রেক্ষিতে দুটো কথা বলা প্রয়োজন। প্রথমত, এ কৌশল বাস্তবায়নের জন্য একটি সংঘবদ্ধ কর্মকাণ্ড দরকার হবে, যার জন্য নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব প্রয়োজন হবে। দ্বিতীয়ত, এর জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তন অত্যাবশ্যকীয়। এ প্রেক্ষাপটে কতগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
এক. আমাদের বাণিজ্যনীতিগুলো, বিশেষত প্রণোদনা কাঠামো ও আমদানি শুল্ক কাঠামো উত্তরণ-সম্পৃক্ত বৈশ্বিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিনা তা নিরীক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশকে সুবিধাভিত্তিক প্রতিযেগিতা থেকে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা-ভিত্তিক প্রতিযোগিতার দিকে যেতে হবে।
দুই. ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো গোষ্ঠী ও কানাডার মতো দেশ রাজি হয়েছে যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কাতার থেকে সদ্য উত্তরিত দেশগুলোকে আরো তিন বছরের জন্য একই রকমের সুবিধা দেয়া হবে, যা তারা উত্তরণ-পূর্ববর্তী সময়ে পেত। এ সুবিধা কী করে পাওয়া যায় এবং কার্যকর করা যায়, তা বাংলাদেশকে নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে।
তিন. এটা পরিষ্কার যে বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং প্রতিযোগিতার কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে। এ বদল বাংলাদেশের উত্তরণ সমস্যাগুলোকে আরো ঘনীভূত করবে। সেই সঙ্গে ওপরে উল্লেখিত বাড়তি তিন বছরের জন্য দেয় সুবিধা শেষে আরোপিত শর্তগুলো কঠিন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব বাণিজ্য, শ্রমমান ও শ্রমিকের অধিকার বিষয়গুলো বিশ্ববাণিজ্যে আরো বড় করে দেখা দেবে। এসব সামগ্রিক পরিবর্তিত অবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তাভাবনা এবং প্রস্তুতি বাংলাদেশে এখন থেকেই প্রয়োজন।
চার. আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চালচিত্র কীভাবে বদলায় এবং উত্তরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত নির্ণায়কগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করা দরকার। এর জন্য একদিকে যেমন অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ, রফতানি বৈচিত্র্যকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি অন্যদিকে মনোযোগ দিতে হবে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আর্থিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দিকে। একটি বিশেষ জায়গায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বড় দরকার এবং সেটা হচ্ছে তথ্য ও উপাত্তের ক্ষেত্রে। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে সরকারি উপাত্ত এত বেশি অতিরঞ্জিত ও প্রভাবিত হয়েছে যে সেগুলো বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। এ প্রবণতা বন্ধ করে অবস্থার পরিবর্তনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, সেই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দৃশ্যমানতা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাও বড় জরুরি।
পাঁচ. বাংলাদেশকে তার রফতানি প্রতিযোগিতার অবস্থানকে আরো উন্নীত করতে হবে এবং সেই সঙ্গে আমাদের অর্থনীতির আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্পৃক্ততাকে জোরদার করতে হবে। এটা না করলে বাংলাদেশের রফতানি শেষ পর্যন্ত হয়তো বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত দেশগুলোয় যাবে না, যেখানে ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার রফতানি সেসব দেশে যাবে। এতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে এক দেশ ও এক পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কখনই অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। রফতানি গন্তব্যের বৈচিত্র্যায়ণ এবং পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। আগে থেকেই এ ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা না গেলে মার্কিন পাল্টা শুল্কনীতি কার্যকর হলে ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে। কেননা আমাদের রফতানিমুখী পণ্য এমনিতেই কম। এ খাতের সিংহভাগ পণ্য আবার রফতানি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাজারে রফতানি বাধাগ্রস্ত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রফতানি পণ্য ও রফতানি গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনার দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণের পাশাপাশি আমাদের স্বল্পমেয়াদে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতেও এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আমাদের শিল্প ও রফতানিমুখী খাতকে কীভাবে টেকসই করা যায় তার পথ অনুসন্ধান করতে হবে।










