দেশের শিশু অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংস্থা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটিতে শিশু অধিকার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে কিছু উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, পিতা-মাতার অপ্রতুল আয়, স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ ব্যয় এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব কারণে শিশুরা স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিষেবায় প্রবেশাধিকার পায় না। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাগুলো পৃথক একটি অধিদপ্তরের প্রস্তাব করেছে। সংস্থাগুলোর মত, একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর শিশু অধিকার সম্পর্কিত নীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও তদারকিতে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। দেশে শিশুদের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে প্রস্তাবটি আমলে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদনটিতে অন্যতম বাধা হিসেবে বাল্যবিবাহের কথা বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর মোট ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছরের আগে এবং ৮ দশমিক ২ শতাংশ মেয়ের ১৫ বছর বয়সের আগে বিয়ে হয়েছে। শুরুতেই তাই দেশে বাল্যবিবাহে প্রকৃত চিত্রটি জানা প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য ও মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে দেশে কিছুটা অগ্রসর হলেও বাল্যবিবাহের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়নি। ২০০৬ থেকে ২০২২ সালের বাল্যবিবাহের তথ্য তুলে ধরে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২৩ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়সের আগেই ৫১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। এ প্রতিবেদন অনুসারে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে। এতে কম বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকিও বাড়ছে। একই সঙ্গে মা ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে। কভিডকালীন বাল্যবিবাহ পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। ইউএনএফপিএর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ১৫-১৯ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে ১০ শতাংশ বেড়েছিল। গত বছরের ডিসেম্বরে ‘কনে হওয়ার জন্যই জন্ম’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্র্যাক। ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ৬০ শতাংশেরও বেশি পরিবারে বাল্যবিবাহের চর্চা হচ্ছে৷। বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েদের ৬ দশমিক ৯ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের নিচে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে পিরোজপুর, সেখানে বাল্যবিবাহের হার ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ। এর পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উঠে আসে যোগ্য পাত্র পাওয়া, দারিদ্র্য, বরপক্ষের যৌতুক কম বা না চাওয়া, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ইত্যাদি।

অর্থাৎ বাল্যবিবাহের পেছনে আর্থসামাজিক ও মানসিক কারণ বিশেষভাবে দায়ী। আবার একদিকে যেমন কন্যাশিশুর বিয়ে হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক দৈন্যে শিশুদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বেড়েছে। চলতি বছর মার্চে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে শ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ১৭ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু নিয়োজিত রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। এর আগে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ৭ অনুযায়ী দেশে ২০২৫ সালের মধ্যে সব সেক্টর থেকে শিশুশ্রম নিরসন পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সব শিশুকে সরিয়ে আনার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বিবিএসের এ জরিপের তথ্য বলছে, শিশুশ্রম পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। অথচ একটা নিরাপদ জীবন সব শিশুর মৌলিক অধিকার।

একদিকে তারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হচ্ছে, অন্যদিকে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে শিশুরা আরো অনেক মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যেমন খাদ্য, বাসস্থান। এ ধরনের মৌলিক শিশুর সংখ্যা নেহাতই কম নয়। দেশে ৩৪ লাখ পথশিশু রয়েছে যারা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তারা দৈনন্দিন জীবনে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতা, খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা বঞ্চিত হচ্ছে সুন্দর ‘শৈশব’ থেকে।

বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য এসব কারণে কোনো শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সুস্থ ও স্বাভাবিক শৈশব যাপন সব শিশুর মৌলিক অধিকার। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা জীবিকা অর্জনের তাগিদে বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বা নিকৃষ্ট ধরনের শ্রমে নিয়োজিত হয়। এতে তারা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়ে। আবার পারিবারিক অসচেতনতা ও আর্থিক দীনতার কারণে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু বাল্যবিবাহের শিকার হবে, সেটিও অপ্রত্যাশিত। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক, সামাজিক, সরকারি-বেসরকারি, জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবার সম্মিলিত প্রয়াস দরকার। পথশিশুদের ওপর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। পথশিশুসহ সব শিশুর সার্বিক সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। এর জন্য একটি স্বতন্ত্র শিশু অধিদপ্তর সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি কার্যকর নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং মানবসম্পদের অভাব দূর করার লক্ষ্যে কাজ করবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহিতা এবং পরিষেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যথাযথ তদারকির ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি শিশুদের বিভিন্ন সেবা প্রদানে নিয়োজিত কর্মীদের সক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কাজ করতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও ও সরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো সহজ হতে পারে। এ অধিদপ্তরের মাধ্যমে শিশু তহবিল ব্যবস্থাপনা ও বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে শিশু অধিকারসংক্রান্ত বিষয়গুলো মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় সম্পাদিত হয়। বাস্তবে এ মন্ত্রণালয় একই সঙ্গে নারী অধিকার, পরিবারকল্যাণ এবং অন্যান্য সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা করে। কিন্তু বর্তমানে শিশুদের অবস্থানের যে ক্রম অবনতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, এটি বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।

তবে একটি পৃথক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করাই শিশু অধিকার নিশ্চিতের জন্য একমাত্র সমাধান নয়। কোনো নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে সেটি যদি সঠিকভাবে পরিচালিত না হয় তাহলে এতে বরং প্রশাসনিক জটিলতা এবং অর্থনৈতিক ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই অধিদপ্তরটি যথাযথভাবে পরিচালিত যেন হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এটিকে শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করাতে হবে। পাশাপাশি শিশু অধিকার সুরক্ষায় সবার আন্তরিক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।