বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সম্প্রতি চলতি অর্থবছরের প্রথম আট-নয় মাসের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও মাথাপিছু আয়ের সাময়িক হিসাব প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে। আর মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮২০ মার্কিন ডলার, যা এ-যাবৎকালের সর্বোচ্চ। কিন্তু এ হিসাব কতটা গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এর অন্যতম কারণ, এখনো দেশের অর্থনীতির আকার বা জিডিপির পরিমাণ নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে পারেনি বিবিএস। অথচ অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা থাকে জিডিপির। বৈশ্বিকভাবে জিডিপির অনুপাতের সঙ্গে ঋণ কিংবা রফতানি থেকে শুরু করে রাজস্ব আয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক নির্দেশকের তুলনা করা হয়ে থাকে। এমনকি মাথাপিছু আয় নির্ধারণের বিষয়টিও জিডিপির সঙ্গে জড়িত। কারণ মাথাপিছু আয় হলো মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) ও মোট জনসংখ্যার মধ্যকার ভাগফল। আর জিএনআই নির্ণয় করা হয় জিডিপির সঙ্গে রেমিট্যান্স যোগ করে। তাই জিডিপির তথ্য সঠিক না হলে নির্ভুল মাথাপিছু আয় নির্ণয় করাও সম্ভব নয়।

এদিকে বিবিএসের জিডিপি-সংক্রান্ত সর্বশেষ হিসাবে দেশের জিডিপির আকার ৪৫৯ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। যদিও অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকরা এ তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তাদের মতে, দেশের জিডিপির প্রকৃত আকার ৩০০-৩৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। এলডিসি থেকে উত্তরণ ও উন্নয়নকে অতিরঞ্জিত করে দেখাতে গিয়ে বিগত সরকার দেশের জিডিপি পরিসংখ্যানকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে। সরকারিভাবে এ তথ্যকে প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে, যাতে করে সরকার বিদেশ থেকে বেশি ঋণ নিতে পারে এবং জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত অনেক নিচে থাকে। সে সময় বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের এ অভিমতগুলো তুলে ধরা হয়েছিল।

কেবল জিডিপির আকার নয়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যানের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে। এজন্য বছরের পর বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), মাথাপিছু আয়, রফতানির তথ্য বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। তবে গত আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের অতিরঞ্জিত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান সংশোধন করা হবে বলে প্রত্যাশা ছিল সবার। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নয় মাস পেরিয়ে গেলেও সেই অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যান সংশোধনের সার্বিক উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। পরিসংখ্যান তৈরির আগের কাঠামোই বহাল আছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা মাথাপিছু আয়ের তথ্যের আগে দরকার দেশের অর্থনীতির আকার ও জিডিপির বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান। নয়তো জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রকৃত চিত্রও পাওয়া যাবে না।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমেছিল কভিডের বছরে। কভিড সংক্রমণের সময়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে লকডাউনসহ নানা বিধিনিষেধ থাকায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫১ শতাংশে নেমে এসেছিল। অর্থনীতিবিদদের মতে, গত বছরের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে শ্লথগতি দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ মন্থরতায়ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমিয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে। প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকেও পাওয়া গিয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ছিল, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছিল, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। আরেক দাতা সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলেছিল, বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে। এখন সরকারি সংস্থা বিবিএস নিজেই বলছে, প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমেছে। কিন্তু প্রকৃত জিডিপির হিসাব ছাড়া সরকারি সংস্থার এ হিসাব নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ রয়েই যায়।

অন্যদিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমার অর্থ হলো উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মানুষের আয়ে। উপরন্তু দীর্ঘকাল ধরে মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে দিনাতিপাত করছে। অন্যদিকে বর্তমানে ডলারের বিনিময় হারে কিছুটা স্থিতিশীলতা থাকলে কয়েক বছর ধরে ডলারের বিনিময় হার ঊর্ধ্বমুখী। ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির মধ্যে দেশে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির ব্যাপারটি অলীক ঠেকে। যদিও ডলারের বিনিময় হার হিসাবে ধরেই মাথাপিছু আয় বেড়েছে বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। জিডিপি প্রবৃদ্ধি যখন নিম্নমুখী, অর্থনীতিতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও বাণিজ্যে মন্দা চলছে, এমন সময় সাময়িক হিসাবে মাথাপিছু আয়ের ঊর্ধ্বমুখিতায় অসংগতি প্রকাশ পায়। আবার মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির অর্থ এই নয় যে দেশের জনগণের জীবনমানে উন্নয়ন ঘটেছে। মনে রাখা প্রয়োজন, মাথাপিছু আয় কোনো একক ব্যক্তির আয় নয়। মাথাপিছু আয়ের হিসাব কখনো ধনী ও নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের বৈষম্য তুলে ধরে না।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের ওপর বর্তমানে আস্থার সংকট তাই তীব্র। জিডিপি, মাথাপিছু আয়ের মতো অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর তথ্যে বাস্তবতার প্রতিফলন না ঘটলে তা কার্যকর নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। বিবিএস এখনো বহু ক্ষেত্রে পুরনো পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। বিবিএসের উচিত এক্ষেত্রে সংস্কার আনা। জিডিপিসহ সব সূচকের প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ করতে হলে সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনীতির স্বার্থে সরকারের উচিত, যেকোনো নীতি প্রণয়নের আগে সঠিক পরিসংখ্যানের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া। প্রকৃত পরিসংখ্যান প্রকাশে বিবিএসকে তার যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

জিডিপি নিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট সবসময় দেখা গেছে। এ সংকট নিরসন জরুরি। কেননা স্বাধীনতার সুদীর্ঘ বছর পরও আমরা একটা বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান ব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি। দুঃখজনক হচ্ছে, বিশ্ব যখন প্রবৃদ্ধির বাইরে গিয়ে সুখ বা ভালো থাকার উপায় নিয়ে কথা বলছে, আমরা তখন আলোচনা করছি জিডিপির পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে, যা হতাশাজনক। এখনো যদি এ পরিস্থিতি থেকে ঘুড়ে দাঁড়ানো না যায় তবে আগামীতে দেশে অর্থনৈতিক সংকট বাড়বে।