বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কাস্টমস প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষ করে বাণিজ্য শুল্ক আহরণে। গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মোট রাজস্ব আদায়ের প্রায় ২৭ শতাংশ এসেছে কাস্টমস থেকে। যদিও দেশের কাস্টমস ব্যবস্থাপনা ঘিরে নানা অভিযোগ হয়েছে। সেকেলে পদ্ধতিতে শুল্কায়ন, দীর্ঘসূত্রতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি ইত্যাদি কারণে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এসব সমস্যার সমাধানে কাস্টমস ব্যবস্থাপনার অটোমেশন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ওপর দীর্ঘকাল ধরে জোর দিয়ে আসছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সরকারও এ বিষয়ে নানা সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বললেও এখন পর্যন্ত কার্যত কোনো উদ্যোগই বাস্তবায়ন হয়নি।

দেশের অর্থনীতিতে বিশ্ব বাণিজ্যের অবদান ক্রমেই বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এর চাপ পড়েছে কাস্টমসের ওপর এবং আগামীতে তা আরো বাড়বে। কাস্টমস ব্যবস্থাপনা যদি দক্ষ ও আধুনিক না হয়, তবে সেই ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবেলা করা কঠিন হবে। সেই সঙ্গে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ভোগান্তিও বাড়বে। শুল্ক ফাঁকির হার বাড়বে এবং দেশের রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থাৎ কাস্টমস ব্যবস্থাপনার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে বৈদেশিক বাণিজ্য ও রাজস্ব পরিস্থিতি। বিশেষ করে আমদানি ও রফতানির আড়ালে অর্থ পাচার ও শুল্ক ফাঁকির মতো ঘটনাগুলোও যে কাস্টমস ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগিয়েই ঘটে থাকে সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এসব ঘটনার রাশ টানতে হলে অবশ্যই কাস্টমস আধুনিকায়ন করতে হবে। মানুষের হস্তক্ষেপ যত কমানো যাবে, এ ধরনের ঘটনার ঝুঁকি তত কমে আসবে। সেই সঙ্গে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে।

ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউসিও) সদস্য দেশ হিসেবে প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি দেশে কাস্টমস দিবস পালন করা হয়ে আসছে। দিনটি মূলত কাস্টমস ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিতেই পালন করা হয়। কাস্টমসকে মূলত রাজস্ব আহরণের সংস্থা হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে এর কার্যপরিধি ব্যাপক। আধুনিক রাষ্ট্রে কাস্টমস এক ধরনের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও কাজ করে। এক দেশ থেকে এ দেশের সীমান্ত দিয়ে কী প্রবেশ করছে এবং দেশ থেকে কী যাচ্ছে তা নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে ভোক্তা সুরক্ষা, শিল্পের প্রতিযোগিতা, অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতেও এটি সহায়ক ভূমিকা রাখে। কাজেই কাস্টমসের কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যতটা প্রয়োজন, কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও এখানে কর্মরতদের পেশাগত দায়বদ্ধতাও জরুরি। যে কারণে এবারের কাস্টমস দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে—অতন্দ্র প্রহরা ও দৃঢ় অঙ্গীকারে দেশের সুরক্ষায় কাস্টমস।

দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রতিপাদ্যটি আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। বিগত সময়ে দেশ থেকে যত অর্থ পাচার হয়েছে তার বড় মাধ্যম ছিল বাণিজ্য। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, দেশ থেকে পাচার হওয়া মোট অর্থের প্রায় ৭৫ শতাংশই পাচার হয় বাণিজ্যের মাধ্যমে। পণ্যের দাম কম-বেশি (আন্ডার এবং ওভার ইনভয়েসিং) দেখিয়ে এবং জাল দলিল তৈরি করে আমদানি ও রফতানির মাধ্যমে এটি করা হয়ে থাকে।

বর্তমান সরকার পাচারকৃত অর্থ ফেরানোর বহু চেষ্টা করলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এটি বেশ কঠিন। এর চেয়ে সহজ হলো অর্থ পাচার রোধ করা। এছাড়া দেশের আমদানি-রফতানি, বন্দরকেন্দ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ—সব মিলিয়ে কাস্টমস প্রশাসনের ওপর রয়েছে গুরুদায়িত্ব। একদিকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির জোর দাবিও রয়েছে। এ দুই ক্ষেত্রে কাস্টমস দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব প্রেক্ষাপটেই অতন্দ্র প্রহরা বা সতর্কতা এবং প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ সামনে আসে।

সতর্কতা মানে শুধু স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকি যাচাই করা নয়। সতর্কতার ক্ষেত্রে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার সক্ষমতা, নিয়ম-নীতির যথাযথ অনুসরণ হচ্ছে কিনা, নীতিগত বিচ্যুতি বোঝা, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালীদের চাপ মোকাবেলা এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। আর এসব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকাটাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অংশ।

বাস্তবতা হলো কাস্টমস ব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকলে তার সুযোগ নেয় অসাধু ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জও বহুমাত্রিক রূপ নিচ্ছে। বৈধ বাণিজ্যের আড়ালে আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, নকল ও নিম্নমানের পণ্যের প্রবেশ সরাসরি সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনকে হয়ে উঠেছে। এতে একদিকে রাজস্ব আয় কমে আসে, অন্যদিকে সৎ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং শিল্পায়নের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। ফলে কাস্টমস সংস্কার কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটাকে কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ কাস্টমসে অটোমেশন, এইও সুবিধা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনের ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, অনলাইন শুল্ক পরিশোধ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা মডিউল—এসব পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে অগ্রগতির লক্ষণ। তবে বাস্তব প্রয়োগে এখনো মানবনির্ভরতা, দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা অভিযোগের জায়গা রয়ে গেছে। মনে রাখা প্রয়োজন, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, যদি তা পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের মনোভাব না থাকে, তবে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। কোন চালান কতদিন আটকে থাকবে, কীভাবে মূল্যায়ন হবে, কোন নথি কতটা গ্রহণযোগ্য—এসব ক্ষেত্রে যখন ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তই মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অভিযোগ, অনিয়ম ও দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ে। ব্যবসায়ীরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, একই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীভেদে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করা হয়। এ বৈষম্য ব্যবসার পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তোলে। এখানেই অটোমেশনের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি।

কাস্টমসের ডিজিটালাইজেশন মানে শুধু অনলাইনে বিল এন্ট্রি করা নয়; বরং পুরো প্রক্রিয়াকে তথ্যভিত্তিক, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত ব্যবস্থার আওতায় আনা। উন্নত বিশ্বে কাস্টমস ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে আগেই ঝুঁকিপূর্ণ চালান শনাক্ত করে। ফলে অধিকাংশ বৈধ পণ্য দ্রুত ছাড় পায়, আর নজরদারি জোরদার করা হয় সন্দেহজনক লেনদেনের ওপর। এতে দ্রুততম সময়ে অবৈধ লেনদেন প্রতিহত করা সম্ভব হয়।

আবার অটোমেশন মানেই কর্মকর্তাদের কাজ কমে যাওয়া নয়। বরং তাদের ভূমিকা হতে হবে আরো বিশ্লেষণধর্মী। এজন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি আবশ্যক। নয়তো কেবল আধুনিক প্রযুক্তি এনে স্থাপন করলেই অটোমেটেড কাস্টমস ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাবে না। তবে কাস্টমস ব্যবস্থাপনার অটোমেশন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কোনো একক সংস্থার কাজ নয়; এজন্য নীতিনির্ধারক, প্রশাসন ও ব্যবসায়ী—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।