পুঁজিবাজারের বিকাশে আস্থার প্রয়োজনীয়তা কতখানি তা বুঝতে হলে পাকিস্তানের পুঁজিবাজারের দিকে লক্ষ করা যেতে পারে। ভারতের পেহেলগামে গত ২২ এপ্রিল সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে পাকিস্তানের বেঞ্চমার্ক কেএসই-১০০ সূচক সাড়ে ১২ শতাংশ পয়েন্ট হারায়। তবে গত ৯ মে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলাকালীন ঘুরে দাঁড়ায় পাকিস্তানের পুঁজিবাজার। এদিন সাড়ে ৩ শতাংশ পয়েন্ট যোগ হয় কেএসই-১০০ সূচকে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণের কিস্তি অনুমোদনের খবর ইতিবাচক প্রভাব রাখে। এমনকি এর আগেও আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার খবরে পাকিস্তানের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গিয়েছিল।

পাকিস্তানের পুঁজিবাজারের এ সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পুঁজিবাজারের গতিশীলতায় আস্থার প্রয়োজনকেই তুলে ধরে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ ধরনের আস্থা সঞ্চার করতে না পারলে তা কোনো দেশের পুঁজিবাজারের বিকাশে সহায়ক হবে বলে প্রতীয়মান হয় না। কিন্তু এক্ষেত্রে যেন পিছিয়ে আছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। একই সঙ্গে ভরসা দেয়ার উদ্যোগে পিছিয়ে আছে এ দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার।

গত বছরের আগস্টে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় পুঁজিবাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে প্রত্যাশা করেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। এ প্রত্যাশার প্রতিফলনও বর্তমান সরকারের শুরুর কয়েক দিনে দেখা গিয়েছিল। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক সূচক ডিএসইএক্স ঊর্ধ্বমুখী হয়েছিল। যদিও এ সূচকের পতনের বৃত্তে ফিরে যেতে বেশি দিন লাগেনি। লেনদেনের গতিও শ্লথ হয়ে পড়ে। দুঃখজনকভাবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার দীর্ঘ নয় মাস পেরিয়ে গেলেও এ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং আরো অবনমন ঘটেছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গত নয় মাসে ডিএসইএক্স ১ হাজার ২৩৫ পয়েন্ট হারিয়েছে। লেনদেনের পরিমাণ নেমে এসেছে ৩০০ কোটি টাকার ঘরে। আর গত বৃহস্পতিবার ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৪ হাজার ৭৮১ পয়েন্টে। একই দিনে দেশের আরেক পুঁজিবাজার চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) নির্বাচিত সূচক সিএসসিএক্স ছিল প্রায় ১ শতাংশ কমে ৮ হাজার ২৪০ পয়েন্টে।

পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি খুবই জরুরি। সেই সঙ্গে গুরুত্ব পায় সুশাসন। এ দুয়ের ঘাটতি থাকলে সাধারণত বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন। যে কারণে বাজার প্রায়ই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। অনেক সময় শেয়ার দর কারসাজির মাধ্যমে সূচকের অস্বাভাবিক ওঠানামা পরিলক্ষিত হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদে সূচক নিম্নগামী হয়ে যায়। দুঃখজনকভাবে দেশের পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের বেশ ঘাটতি রয়েছে। নেই নিয়ম-নীতির পরিপালনও। বিশেষত বিগত সরকারের দেড় দশকে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের মতো পুঁজিবাজারেও অবাধ লুটতরাজ হয়েছে। অসংখ্য দুর্বল ও প্রায় অস্তিত্বহীন কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করে পুঁজিবাজারের বোঝা বাড়ানো হয়েছে। লাগামহীন কারসাজির মাধ্যমে দুর্বল মৌলভিত্তির, জাংক কোম্পানির শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। ফ্লোর প্রাইস আরোপ, সার্কিট ব্রেকারের ঊর্ধ্বসীমা ও নিম্নসীমা বেঁধে দেয়া ইত্যাদি নানা কৃত্রিম ব্যবস্থায় বাজারের শোচনীয় অবস্থা ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। আবার বিভিন্ন সময়ে শেয়ার কারসাজিতে অভিযুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো বিচার ও শাস্তির পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এভাবে মূলত বিগত সরকার পুঁজিবাজারকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

স্বাভাবিকভাবে পুঁজিবাজার অংশীজন বা বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার করবে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু একদিকে এখনো কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন হয়নি, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে নিয়ে গেছে। সংস্থাটি গত সেপ্টেম্বরে পুঁজিবাজারে সংঘটিত নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও কারসাজির ঘটনা খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু শুরু থেকেই এ অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটি নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পুঁজিবাজারের অংশীজনদের নিয়ে গঠিত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনিতেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন ও পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসি সবসময় ব্যর্থ হয়েছে। এমন বিতর্কিত কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংস্থাটির কার্যক্রম আরো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার না হয়ে বরং সংকট তীব্র হয়েছে। বলা বাহুল্য, বিনিয়োগকারীদের ভরসা দিতে না পারায় পুঁজিবাজারের সংস্কারে সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা আসার পরও বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

এসব সংকটের পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে দুর্দশা, উচ্চ সুদহারের মতো সংকটগুলোও পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলেছে। অর্থনৈতিক সংকট ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা তৈরি করেছে। এতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ও মুনাফা কমেছে। কেউ কেউ লোকসানের মধ্যেও পড়েছে। অর্থনীতির এমন দোদুল্যমান অবস্থায় ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারের পরিবর্তে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন, যা পুঁজিবাজারে তারল্য সংকটও তৈরি করেছে। এসব চ্যালেঞ্জও বিনিয়োগকারীদের মনে হতাশার জন্ম দিয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের অনেকেই এরই মধ্যে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছেন। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনেকেই নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না। কমেছে বিদেশী ‍বিনিয়োগও। অথচ পুঁজিবাজারের জন্য বিদেশী বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশী বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করেই একটি স্থানীয় বা আঞ্চলিক পুঁজিবাজার বৈশ্বিক হয়ে ওঠে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে দেশের পুঁজিবাজারের মোট লেনদেনে বিদেশীদের অংশগ্রহণের পরিমাণ ১ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ফ্লোর প্রাইস, নীতির অধারাবাহিকতা, ভালো শেয়ারের অভাব, বিনিময় হারের অস্থিরতা ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে বিদেশীরা দেশের পুঁজিবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। পাশাপাশি অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় এটি অপরিণতই থেকে গেছে। এখান থেকে অর্থ সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা ও কার্যকর বন্ড মার্কেটের অনুপস্থিতি উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারবিমুখ করছে। যে কারণে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে প্রায় সব সূচকেই এ দেশের পুঁজিবাজারের অবস্থান সবার নিচে। বলা বাহুল্য, সব মিলিয়ে বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে এবং পুঁজিবাজারের গতি কমেছে।

এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারের গতিশীলতা বাড়াতে হলে জরুরি ভিত্তিতে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হতে পারেন। বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশের পুঁজিবাজার টেকসই হবে এমন বার্তা বিনিয়োগকারীদের দেয়া প্রয়োজন। এজন্য ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়ানোর বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। এতে বিনিয়োগকারীদের মাঝে স্বল্প সময়ে ইতিবাচক বার্তা দেয়া সম্ভব হবে। গত ১৬ বছরে দেশের পুঁজিবাজারে কোম্পানি তালিকাভুক্তির নামে অসংখ্য অনিয়ম হয়েছে। এ সময়ে যেসব কোম্পানি পুঁজিবাজারে এসেছে তার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এরই মধ্যে দুর্বল কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে যেমন তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি এর বিপরীতে ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা আবশ্যক।

তবে সর্বাপেক্ষা জরুরি হলো সুশাসন ফেরানো। সুশাসন ছাড়া কখনই আস্থা অর্জন সম্ভব নয়। আর আস্থা ছাড়া পুঁজিবাজারের বিকাশ যে অসম্ভব, তা শুরুতেও উল্লেখ করা হয়েছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পুঁজিবাজারকে দাঁড় করানোর প্রয়াস কিছুটা হলেও দৃশ্যমান হওয়া উচিত, যাতে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। আর সেই পথ সরকারকে অনতিবিলম্বে খুঁজে বের করতে হবে।