অতিরঞ্জিত ও বাস্তবতাবিবর্জিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করায় দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রশ্নবিদ্ধ। সংস্থাটির প্রতি জনগণের আস্থার অভাব তৈরি হয়েছে। আস্থার সংকট আরো তীব্র হয় বিগত সরকারের আমলে। ফলে বিগত সরকারের পতন ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সংস্থাটি সংস্কারের জোর দাবি ওঠে। এ লক্ষ্যে অনেকগুলো উদ্যোগ নেয়া হয়, যার একটি ছিল বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স কমিটি গঠন। গত মাসে বিবিএস শক্তিশালীকরণে গঠিত এ টাস্কফোর্স তাদের সুপারিশমালা পেশ করে। এছাড়া গতকাল বিবিএস আয়োজিত বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস পালন অনুষ্ঠানে টাস্কফোর্স কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। জানা গেছে, চূড়ান্ত প্রতিবেদন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এরই মধ্যে চার সদস্যের বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রত্যাশা রয়েছে, প্রকৃতপক্ষে টাস্কফোর্সের সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে এবং এর মাধ্যমে বিবিএসকে শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

বর্তমান সরকার বিবিএস সংস্কারে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যে কারণে পরিসংখ্যানের প্রতি অনাস্থা দূর হয়নি। অথচ সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া যথাযথ নীতি প্রণয়ন করা যায় না সে কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিগত সরকার সংস্থাটিকে ব্যবহার করে জনসংখ্যা, জিডিপির আকার-প্রবৃদ্ধি থেকে শুরু করে অর্থনীতির প্রতিটি খাতেই ভুল ও প্রশ্নবিদ্ধ পরিসংখ্যান তৈরি ও উপস্থাপন করেছে। ফলে বর্তমান সরকারের প্রতি বড় প্রত্যাশা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ পরিসংখ্যান সংশোধনে বা সেগুলোর প্রতি আস্থা ফেরানোর মতো উদ্যোগ নেয়া হবে। কিন্তু তা হয়নি। বরং সংস্থাটি জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও এমন তথ্য প্রকাশ করে যাচ্ছে, যা নিয়ে বারবার সমালোচনার মুখে পড়ছে। উদাহরণ হিসেবে আগস্টের মূল্যস্ফীতির তথ্যের কথাই বলা যায়। বিশ্লেষকরাও বলে আসছেন, পরিসংখ্যান তৈরির ক্ষেত্রে আগের কাঠামো বহাল থাকার পাশাপাশি অতীতের অতিরঞ্জিত সব পরিসংখ্যান সংশোধনে সার্বিক উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। ফলে সংস্থাটি এখনো আগের অতিরঞ্জিত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান থেকে বের হতে পারছে না। এমনকি বিবিএসের তথ্যে সন্দেহের কথা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাও স্বীকার করেন। চলতি বছরের শুরুতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় বিবিএসের জরিপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যেহেতু আগের নিয়ম বলবৎ আছে, কাজেই চোখ বন্ধ করে প্রকাশ করে দিতে হয় আমাকে’। তাই এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সন্দিহান হতে হয় যে টাস্কফোর্সের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য কমিটি গঠন হলেও শেষ পর্যন্ত সুপারিশগুলো কতটা বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু বিবিএসকে নির্ভরযোগ্য করে তোলা অতীব জরুরি।

দেশের বিভিন্ন খাতে পরিচালিত বিবিএসের তথ্য-উপাত্তের ওপর নির্ভর করে সরকার ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিকৌশল নির্ধারিত হয়। ফলে এসব তথ্য-উপাত্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও আস্থার সংকট থাকলে এগুলোর ওপর ভিত্তি করে নেয়া নীতিকৌশলও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ত্রুটিপূর্ণ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে নেয়া নীতিকৌশলের কার্যকারিতার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জিডিপি বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। কমিয়ে দেখানো হয়েছে মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, জনসংখ্যার হার। বিপরীতে কোনো নীতিই সেভাবে কার্যকর হয়নি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ প্রয়োজন।

বিবিএসকে শক্তিশালী করতে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থাটিতে এক ধরনের প্রকল্প সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা তাদের নিয়মিত কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা বিবিএসের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কমিয়েছে। প্রকল্পভিত্তিক কাজের কারণে মাঠপর্যায়ের জরিপের ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে। অন্যদিকে তথ্য যাচাইয়ের মান কমেছে এবং সদর দপ্তরকেন্দ্রিক কাজ বেড়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও জটিল আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এবং প্রকল্পনির্ভরতা মিলে বিবিএসের তথ্য প্রকাশের প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত ও বিকৃত করেছে। এর আলোকে বিবিএসকে শক্তিশালী করতে টাস্কফোর্স কমিটি অনেকগুলো সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো স্বাধীন বিবিএস গঠন, বিদ্যমান পরিসংখ্যান আইন সংশোধন, দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ। এছাড়া পরিসংখ্যানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সাত সদস্যের একটি কাউন্সিল গঠনেরও প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিবিএসকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব।

সর্বাগ্রে বিবিএসকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান করা জরুরি। কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে। রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি বিবিএসের কাঠামোগত দুর্বলতা ও দক্ষ জনবলের ঘাটতিও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষ জনবল না থাকলে সঠিক পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও বিশ্লেষণ সম্ভব হয় না। যে কারণে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রণয়নকারী সংস্থার তথ্যের সঙ্গে বিবিএসের তথ্যে বড় ব্যবধান পাওয়া যায়। আবার আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিসংখ্যান বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান আশাব্যঞ্জক নয়। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর অফিশিয়াল স্ট্যাটিস্টিকস সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৭০ দশমিক ৮। আর বিশ্বব্যাংকের সূচকে স্কোর ৩০। পরিসংখ্যান সক্ষমতার দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে দুর্বলতম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বিবিএসের নিজস্ব জরিপেও দেখা গেছে, তাদের তথ্য নিয়ে ৬৫ শতাংশ ব্যবহারকারী অসন্তুষ্ট। এছাড়া বিবিএস ও সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের ‘ব্যবহারকারী সন্তুষ্টি জরিপ-২০২৪’ শীর্ষক যৌথ জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, মোট ব্যবহারকারীর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ দশমিক ১৬ শতাংশ বিবিএসের মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। সংশয় রয়েছে বিবিএসের অন্য সব তথ্য নিয়েও। ২৬ শতাংশ মানুষ ন্যাশনাল অ্যাকাউন্ট পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দিহান। অথচ এর মাধ্যমে জিডিপির হিসাব-নিকাশ করা হয়। এ জরিপে অংশ নেয়া মাত্র ২৯ শতাংশ ব্যবহারকারী বিবিএসের পরিসংখ্যানের মান নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ কেবল রাজনৈতিক প্রভাব নয়—দুর্বল পদ্ধতি, পুরনো জরিপ কাঠামো, অনভিজ্ঞ মানবসম্পদ ও প্রশাসনিক অদক্ষতা সব মিলিয়ে বিবিএস এমন প্রশ্নবিদ্ধ সংস্থায় পরিণত হয়েছে। উপরন্তু প্রকল্পনির্ভর কাজ করার সংস্কৃতি এটিকে আরো দুর্বল করেছে।

বিবিএসকে প্রকল্পনির্ভরতা ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে একটি স্বশাসিত, দক্ষ ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। টাস্কফোর্সের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করে একটি স্বাধীন জাতীয় পরিসংখ্যান কাউন্সিল গঠন করা গেলে সরকারের প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ ও প্রকাশ সম্ভব হবে বলেই প্রত্যাশা রয়েছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহার ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।