দেশে উচ্চ শিক্ষার পরিসর বেশ বড়। সময়ের পরিক্রমায় সরকারি-বেসরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি স্নাতক-স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ও বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিজস্ব অবস্থানের দিকে লক্ষ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিক্ষার মানোন্নয়ন না ঘটে এখানে বরং শিক্ষার পরিবেশ ক্রমাগতভাবে অধঃপতিত হয়েছে। সম্প্রতি বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম বাংলাদেশ উচ্চ শিক্ষা সম্মেলনের বক্তাদের আলোচনায় শিক্ষা ব্যবস্থার এ দুর্দশার চিত্র ফুটে উঠেছে। আলোচকদের মতে, দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষা-সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। আবার শিক্ষক নিয়োগেও প্রচণ্ড অনিয়ম হয়েছে। শিক্ষকদের লেজুড়বৃত্তিক দলীয় রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতির নামে দখলদারত্ব এবং দুর্বৃত্তায়ন পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে পঙ্গু হওয়ার পথে নিয়ে গেছে। এ সম্মেলনে বক্তারা জোর দিয়েছেন শিক্ষা ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের প্রতি তথা উচ্চ শিক্ষার মানোয়ন্ননে। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটিই অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে। কারণ মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা আরো কঠিন হয়ে উঠবে।

  • উচ্চ শিক্ষা মানুষের জ্ঞানের বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি তার প্রায়োগিক জ্ঞানের মাধ্যমে দেশ ও অর্থনীতির সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হন। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সেতুবন্ধ থাকা। তা না হলে কর্মক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। আর বর্তমানে দেশে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম সমস্যা এটি। এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কদাচিৎ সংযোগ রয়েছে। পাঠ্যক্রম ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে নেই সামঞ্জস্য। যে কারণে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষিত বেকারের হার ২০২২ সালের ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে হয়েছে ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ। সংস্থাটির হিসাবে, দেশে বর্তমানে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৯ লাখ ৬ হাজার। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৯৯ হাজার।
  • এক্ষেত্রে দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়ে আসছে। এক. শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করার পর যোগ্যতা ও চাহিদা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। দুই. নিয়োগদাতারা দক্ষতা অনুযায়ী কর্মী খুঁজে পাচ্ছেন না। এ দুই বিষয়ই শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সংযোগ না থাকাকেই নির্দেশ করে। বেসরকারি খাতের নিয়োগদাতাদেরও মত, গবেষণার অপ্রতুলতা এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগের ঘাটতির কারণে গ্র্যাজুয়েটদের প্রায়োগিক দক্ষতা গড়ে ওঠে না। ফলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোয় দক্ষ ও যোগ্য কর্মীর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে দক্ষ কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়।
  • এখানেই শিক্ষার মানের প্রশ্নটি নতুনভাবে তৈরি হয়। মানের দিক থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থানগত দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মানসম্মততা নিয়ে প্রতি বছর ‘কান্ট্রিজ উইথ বেস্ট পারফর্মিং এডুকেশন সিস্টেম’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন। চলতি বছর ম্যাগাজিনটি শিক্ষা মানের ভিত্তিতে ৯৩টি দেশের র‍্যাংকিং প্রকাশ করেছে, এ তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। আবার এ বছর প্রকাশিত টাইমস হায়ার এডুকেশন র‌্যাংকিংয়ে দুই হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের মোট ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে ঠিকই, তবে বিশ্বের সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নাম নেই কোনো প্রতিষ্ঠানের। এটিও শিক্ষার মান, শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাত, গবেষণার মান, সাইটেশন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীসহ কয়েকটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়। বিশ্বের ১১৫টি দেশের মধ্যে এ মূল্যায়ন করা হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রমের অপ্রতুলতা ও পাঠ্যক্রমকে দায়ী বলে মনে করেন অধিকাংশ শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতসংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। বিশ্বায়নের এ ‍যুগে উচ্চ শিক্ষার মান নিশ্চিতের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন নয়তো ব্যাহত হবে। বর্তমানে উচ্চ শিক্ষিতদের অনেকেই চাকরি না পেয়ে রাষ্ট্রের জন্য বড় বোঝা তৈরি হচ্ছে। বেকারত্ব নিরসনে চাই কর্মমুখী শিক্ষার বিকাশ।
  • এর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষা-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রম দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুপাতে প্রণয়ন করতে হবে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও মানসম্মত গবেষণার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগও অপরিহার্য। তাই শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া হতে হবে মেধাভিত্তিক। স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ বন্ধের সংস্কৃতি দূর করা জরুরি।
  • এর বাইরে অত্যন্ত জরুরি হলো শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। কারণ আঁচল ফাউন্ডেশনের এক জরিপে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান, হলের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ, জ্যেষ্ঠ সহপাঠী ও শিক্ষকদের বুলিং, যৌন হয়রানি, ভবিষ্যৎ পেশা নিয়ে দুশ্চিন্তা, মন খুলে কথা বলতে না পারার কারণে হতাশা ও বিষণ্নতায় ভোগেন প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী। প্রচণ্ড মানসিক অস্থিরতা ও প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পারার কারণে ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর মনে আত্মহত্যার চিন্তাও এসেছে। বলা বাহুল্য, এমন পরিবেশ পড়াশোনার জন্য খুব বেশি উপযুক্ত নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের সঙ্গে সংলাপের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। এর জন্য সুব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের মান-মর্যাদা, গবেষণার সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি ও বেতন কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।
  • দেশের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো, এর সম্প্রসারণ সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে হয়নি। সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থানের দিকে লক্ষ করলে বোঝা যায়। যেমন বিগত সরকারের শেষ সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। আবার দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৫। এর মধ্যে ২৫টিই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এ সরকারের আমলে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করায় উচ্চ শিক্ষার মান কমেছে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়া আরেকটি সমস্যা হলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশে মানসম্পন্ন শিক্ষক নেই। উপরন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনায় একটা ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে। সার্টিফিকেটসর্বস্ব ডিগ্রিধারী বেড়েছে। কিন্তু মানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন কলেজ নিয়েও পুনর্বিবেচনার দরকার রয়েছে। এছাড়া দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নানা ব্যবধান ও বৈষম্য বিদ্যমান। সেগুলোও কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সেদিকে সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন। যেমন উচ্চ শিক্ষা সম্মেলনে একজন বক্তা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি দিতে না পারার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। মোট কথা, উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে সব সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে যাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে ওঠে। পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারে দেশ।