গত ৩ জানুয়ারি রাতে মার্কিন সাইবার কমান্ড ভেনিজুয়েলার পুরো বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর ‘নেভি সিল টিম সিক্স’ এবং ডেল্টা ফোর্সের সদস্যরা অত্যাধুনিক স্টিলথ হেলিকপ্টার ব্যবহার করে সরাসরি মিরা ফ্লোরেস প্রাসাদে হানা দেয়। ভেনিজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা টের পাওয়ার আগেই অভিযান সম্পন্ন করে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে মার্কিন বাহিনী। ৩ জানুয়ারি ভোর ৪টা ২১ মিনিটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সোশ্যাল মিডিয়া ট্রথ সোশ্যালের পোস্ট এ অভিযানের বিষয় তুলে ধরে, যা বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দেয়। মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ নামের এ 'দুঃসাহসিক অভিযান' কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চিরাচরিত সংজ্ঞাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। এ ঘটনাটি লাতিন আমেরিকার দীর্ঘদিনের সার্বভৌমত্ব সংকটকে এক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার চেয়ে ভূরাজনৈতিক আধিপত্য ও খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ প্রাধান্য পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে আটক করার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান যুক্তি দেখিয়েছে। প্রথম যুক্তিটি হলো নারকো-টেররিজম। মাদুরোর বিরুদ্ধে ২০২০ সালে দায়ের করা 'নারকো-টেররিজম' চার্জশিটটি ২০২৬-এর অভিযানের প্রধান আইনি ভিত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে, মাদুরো ভেনিজুয়েলার সামরিক ও সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত একটি বিতর্কিত ও গোপন নেটওয়ার্ক 'কার্টেল অব দ্য সানস'-এর প্রধান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে বছরে ২৫০ টন কোকেন পাচারের মাধ্যমে 'মাদক যুদ্ধ' চালিয়ে আসছেন। দ্বিতীয় যুক্তি হলো মাদুরোর শাসনামলের বৈধতা। ওয়াশিংটনের মতে, ২০২৪-২৫ সালের নির্বাচনে কারচুপির পর মাদুরো আর বৈধ রাষ্ট্রপতি নন, বরং একজন জবরদখলকারী' বা 'অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী। তৃতীয় যুক্তি হলো মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা। ২০২০ সালের ২৬ মার্চ নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট মাদুরোর বিরুদ্ধে ১৫ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। মার্কিন বিচার বিভাগ এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ ঐতিহাসিক ঘোষণা দেয় এবং তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার এ অভিযোগপত্র প্রকাশ করেন। আদালতের মতে, মাদুরো দুই দশক ধরে 'কার্টেল অব দ্য সানস'-এর মাধ্যমে মাদক চোরাচালান পরিচালনা করছেন। যেহেতু এ মাদক সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে আমেরিকার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তার ক্ষতি করছে, তাই মাদুরো আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিচারিক আওতার মধ্যে পড়ে এবং তিনি আন্তর্জাতিক বিচারিক আওতার বাইরে নন। মূলত ২০২০ সালের সেই পুরনো পরোয়ানাকেই এ অভিযানের প্রধান আইনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে মার্কিন সৈন্যরা। তাদের মতে, মাদুরো একজন 'পলাতক আসামি' এবং তাকে আটক করা কোনো যুদ্ধ নয়, বরং এ অভিযানের মাধ্যমে একটি আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে মাত্র।
লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ১৮২৩ সালের মনরো নীতি থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের এ অভিযান পর্যন্ত একটি সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা রয়েছে। মনরো নীতির মূল কথা ছিল পশ্চিম গোলার্ধের যেকোনো বিদেশী হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রতিকূল পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে। শীতল যুদ্ধের সময় এ নীতির ব্যবহার ছিল ‘কমিউনিজম বিরোধী’ ফোকাসে, কিন্তু শীতল যুদ্ধোত্তর সময়ে তা সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে রিজিম-চেঞ্জ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘকাল ধরে দক্ষিণ আমেরিকাকে তাদের 'পেছনের উঠোন' হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। বিংশ শতাব্দীতে চিলিতে আলেন্দে সরকারের পতন বা গুয়াতেমালায় সামরিক অভ্যুত্থান—সবই ছিল মার্কিন 'নিরাপত্তা নিশ্চিত করার' কৌশল। ২০২৬ সালের সরাসরি সামরিক অভিযান মূলত সেই পুরনো মনরো নীতির এক চরম উগ্র ও আধুনিক সংস্করণ।
ভেনিজুয়েলা ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘনিষ্ঠ জ্বালানি সহযোগী ছিল। তবে ১৯৯৯ সালে হুগো চাভেজের ক্ষমতায় আরোহণ এ সমীকরণ বদলে দেয় যার মূলে রয়েছে সম্পদ নিয়ন্ত্রণ এবং আদর্শিক পার্থক্য। হুগো চাভেজের আমলে তেল উত্তোলনে রাষ্ট্রীয় সংস্থা পিডিভিএসএর একচেটিয়া ক্ষমতা এবং মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রস্থান ছিল সম্পর্কের অবনতির প্রথম ধাপ। চাভেজের 'বলিভারিয়ান বিপ্লব' ও 'একুশ শতকের সমাজতন্ত্র' এবং দক্ষিণ আমেরিকায় মার্কিনবিরোধী 'পিংক টাইড' ব্লক গঠন ওয়াশিংটনের আধিপত্যে আঘাত হানে।
ভেনিজুয়েলার ওপর আগ্রাসনে যুক্তরাষ্ট্র বহুমাত্রিক কৌশল প্রয়োগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার তেল রফতানি এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় দেশটির প্রবেশাধিকারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অনেক বিশ্লেষক একে 'অর্থনৈতিক যুদ্ধ' হিসেবে অভিহিত করেন, যা দেশটির মুদ্রাস্ফীতি ও মানবিক সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে। ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি হুয়ান গুয়াইদো যখন নিজেকে ভেনিজুয়েলার 'অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি' হিসেবে ঘোষণা করেন এবং তার ঠিক কয়েক মিনিটের মাথায় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন তাকে স্বীকৃতি দেয়, এটি ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার ভেতরে একটি 'ভার্চুয়াল' বা সমান্তরাল সরকার কাঠামো তৈরি করেছিল। ওয়াশিংটন দাবি করেছিল যে যেহেতু ২০১৮ সালের নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, তাই মাদুরো আর রাষ্ট্রপতি নন। সংবিধান অনুযায়ী ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির স্পিকার (গুয়াইদো) হলেন বৈধ নেতা। গুয়াইদোকে স্বীকৃতি দেয়ার পর পরই যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর মার্কিন শাখা 'সিটগো' এবং বিদেশের ব্যাংকে থাকা ভেনিজুয়েলার স্বর্ণ ও অর্থের নিয়ন্ত্রণ গুয়াইদোর প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেয়। এটি ছিল মাদুরো সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করার একটি কৌশল। প্রায় ৬০টি দেশ গুয়াইদোকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, যা মাদুরোকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একা করে ফেলে। ভেনিজুয়েলাকে আঞ্চলিক সংস্থাগুলো থেকে বহিষ্কারের চাপ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে মামলা প্ররোচিত করাও এ চাপের অংশ। এটি ছিল 'রেজিম চেঞ্জ' বা শাসন পরিবর্তনের একটি নব্য-কৌশল। কোনো দেশে সরাসরি সৈন্য না পাঠিয়ে কেবল 'স্বীকৃতি' এবং 'নিষেধাজ্ঞা' দিয়ে একটি সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টা। যদিও শেষ পর্যন্ত গুয়াইদো সফল হননি এবং ২০২৪-এর দিকে তার নিজের জোটই তাকে সরিয়ে দেয়।
ভেনিজুয়েলার এ পরিস্থিতি পুরো লাতিন আমেরিকার জন্য এক সার্বভৌমত্বের সংকট তৈরি করেছে। যখন একটি সুপারপাওয়ার কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এবং পছন্দসই নেতা বেছে নিতে চায়, তখন সেই রাষ্ট্রের 'স্বনিয়ন্ত্রণাধিকার' হুমকির মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪) এবং ২(৭) স্পষ্টভাবে অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং শক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দাবি, যখন একটি রাষ্ট্র ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংস করে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের 'রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব' থাকে। অন্যদিকে সমালোচকরা বলেন, মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিজেই এক ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। কারণ এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভেনিজুয়েলায় ২০২৬-এর আক্রমণ বিশ্বকে নতুন করে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। রাশিয়া একে 'আন্তর্জাতিক দস্যুতা' হিসেবে অভিহিত করে ভেনিজুয়েলার সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে। চীন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। কিউবা, নিকারাগুয়া ও বলিভিয়া সরাসরি মার্কিনবিরোধী অবস্থান নিলেও, অঞ্চলের বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো (যেমন ব্রাজিল) আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজছে। তবে তারা সবাই একমত যে মার্কিন একতরফা পদক্ষেপ এ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলো সাধারণত গণতন্ত্রের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে থাকলেও, সরাসরি সামরিক আক্রমণের ফলে সৃষ্ট শরণার্থী সংকট নিয়ে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ভেনিজুয়েলা সংকটের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং জাতিসংঘ তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে আটক করার সময় দাবি করেছে যে তারা আসলে এ 'ব্যর্থ সমাজতন্ত্র' থেকে ভেনিজুয়েলাকে মুক্ত করছে। চাভেজ এবং পরবর্তী সময়ে মাদুরো সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দোহাই দিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে শুরু করেন। তারা একে 'গণতন্ত্রের বিনাশ' হিসেবে অভিহিত করে। তাছাড়া মাদুরো দুই দশক ধরে 'কার্টেল অব দ্য সানস'-এর মাধ্যমে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাদক চোরাচালান করে আমেরিকার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তার ক্ষতি করছে, তাই মাদুরো আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিচারিক আওতার মধ্যে পড়ে। তাই মাদুরোর একজন 'পলাতক আসামি' এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পলাতক আসামিকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। অন্যদিকে মাদুরো সমর্থকদের কাছে এ সমাজতন্ত্র হলো তাদের জাতীয় গর্ব এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক। ভেনিজুয়েলায় আক্রমণের মাধ্যমে একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ করা ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্বকে চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে, যা পুরো লাতিন আমেরিকায় সার্বভৌমত্বের সংকট তৈরি করবে। ২০২৬ সালের এ মার্কিন আগ্রাসন লাতিন আমেরিকাকে কেবল অস্থিতিশীলই করেনি, বরং বিশ্বকে এক বিপজ্জনক 'জঙ্গল আইন' এর দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে রাষ্ট্রগুলোর স্বনির্ভরতা এবং একটি নতুন ও কার্যকর বৈশ্বিক সালিশি ব্যবস্থার ওপর, যেখানে সার্বভৌমত্ব কেবল শক্তিশালী দেশের সুবিধা হবে না, বরং প্রতিটি দেশের মৌলিক অধিকার হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে।
ড. রাজিউর রহমান: শিক্ষক, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ড. মো. আবু সালেহ: শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।










