বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতন-পরবর্তী সহিংসতায় সারা দেশে আহত হয়েছেন শত শত মানুষ। চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে। চিকিৎসা শেষে বেশির ভাগই ছাড়পত্র নিয়ে চলে গিয়েছেন। আবার অনেকেই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাসায় চলে যাওয়ার মতো অবস্থায় থাকলেও পুনর্বাসনের দুশ্চিন্তাসহ বিভিন্ন কারণে তারা হাসপাতাল ছাড়ছেন না। এতে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্মকাণ্ড বিঘ্নিত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসার পরিবেশ। হাসপাতালে চিকিৎসার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দরকার আহতদের জন্য পুনর্বাসনসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ৫৫ জন রোগী রয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৪৫ জন ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অবস্থায় রয়েছেন। বাকি আট থেকে ১০ জনকে হাসপাতালে থাকতে হবে। অন্যদিকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) জুলাইয়ে আহত রয়েছেন ৭৫ জন। এর মধ্যে অন্তত ৫০ জন ছাড়পত্র পাওয়ার মতো। কিন্তু তারা হাসপাতালেই রয়ে গেছেন।
অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। অনেকেই ছাড়পত্র নিয়ে যাওয়ার মতো হলেও তারাও হাসপাতাল ছাড়ছেন না। কারণ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুদান আসে হাসপাতালকে ভিত্তি করে। আহতদের অধিকাংশই দরিদ্র। আবার কেউ কেউ পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। হাসপাতালের বাইরে অনুদান সহায়তা পেতে বেশি সময় প্রয়োজন কিংবা পাওয়া সম্ভব নয়। হাসপাতাল ছেড়ে গেলে তারা অনুদান পাবেন না, এমন ভাবনায় হাসপাতাল ছাড়ছেন না। সুস্থ হওয়ার পরও অনেকেই হাসপাতাল না ছাড়ায় চিকিৎসার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে পড়ে থাকায় অনেক আহতের পরিবারে অশান্তি দেখা দিয়েছে। অল্প বয়সে চোখ ও হাত-পায়ের মতো অঙ্গহানি হওয়ায় অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। কেউ কেউ সাংসারিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছেন তারা। আবার অনেকের চোখে এখনো গুলি রয়ে গেছে। উন্নত চিকিৎসা দরকার। অঙ্গহানি ঘটার কারণে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কী করে বাকি জীবন চলবেন জানা নেই। অনেকেই কর্মক্ষমতাও হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে মানসিকভাবে সুস্থ নন তারা। ভবিষ্যৎ কর্মের নিশ্চয়তা না থাকায় তারা হাসপাতাল ছাড়তে চাইছেন না। এরই মধ্যে গত শনিবার চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসারত চারজন বিষপানে আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন। তাই সরকারের উচিত হবে আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। পুনর্বাসনের অনিশ্চয়তার শঙ্কায় অনেকেই হাসপাতাল ছাড়ছেন না। আহতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে তখন তাদের কর্মের অনিশ্চয়তা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা কাজ করবে না। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আহতদের পুনর্বাসনে গুরুত্ব দেয়া উচিত। তারা হাসপাতাল ছেড়ে দিলে হাসপাতালে সেবার পরিবেশ ফিরে আসবে এবং শৃঙ্খলাও বজায় থাকবে।
এদিকে ১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের সারা দেশে সব সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হেলথ কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। এ সেবার মাধ্যমে যেকোনো সময় দেশের যেকোনো সরকারি হাসপাতালে কার্ডধারীরা চিকিৎসা পাবেন। এ কার্ড সবসময়ই তাদের কাছে থাকবে।
এদিকে শাস্তির বিধান রেখে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং আহত ছাত্র-জনতার কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং আহতরা কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ, আবাসন সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পাবেন। তবে কেউ মিথ্যা পরিচয়ে আর্থিক সুবিধা নিলে দুই বছরের কারাদণ্ড ভোগ করার পাশাপাশি গৃহীত অর্থের দ্বিগুণ ফেরত দিতে হবে। খসড়ায় বলা হয়েছে, ‘শহীদ ব্যক্তির আর্থসামাজিক অবস্থা, বয়স, তার ওপর পরিবারের নির্ভরশীলতা পর্যালোচনা করে এককালীন বা মাসিক আর্থিক সহায়তার পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধি করা যাবে।’ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা এর রাজনৈতিক অঙ্গ সংগঠনের সদস্যদের আক্রমণে শহীদ হয়েছেন এমন পরিবার’ আর্থিক সহায়তা পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবেন। গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ এবং আহত ব্যক্তিরা যথাক্রমে ‘জুলাই শহীদ’ এবং ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলে খসড়া অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। অধ্যাদেশে আহতদের তিন শ্রেণীতে অভিহিত করা হয়েছে। ‘ক’ শ্রেণীতে অতি গুরুতর আহতদের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘ন্যূনতম এক চোখ/হাত/পা ক্ষতিগ্রস্ত ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অনুপযোগী, সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন, সম্পূর্ণভাবে মানসিক বিকারগ্রস্ত এবং কাজ করতে অক্ষম বা অনুরূপ আহত ব্যক্তি’। ‘খ’ শ্রেণীর মধ্যে থাকবেন ‘আংশিক দৃষ্টিহীন, মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত বা অনুরূপ আহত ব্যক্তি’। ‘গ’ শ্রেণীর মধ্যে থাকবেন ‘যারা দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হচ্ছে, চিকিৎসা শেষে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে সক্ষম হবেন এবং যারা এরই মধ্যে চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে সক্ষম’। আহত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ এবং সরকার নির্ধারিত বিশেষায়িত হাসপাতালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে সরকার। চিকিৎসাসেবা পেতে কোনো ধরনের আবেদন করতে হবে না, তবে সরকার থেকে ইস্যুকৃত হেলথ কার্ড দেখাতে হবে। অধ্যাদেশের অধীনে ঢাকায় ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর’ গঠন করা হবে, যা জুলাই অভ্যুত্থানের আদর্শ ও চেতনাকে জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে বহুমুখী উদ্যোগ নেবে। প্রয়োজনে ঢাকার বাইরেও অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের সুযোগ রাখা হবে। আহতদের সহায়তা দিতে এটি সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ। তবে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে আহতদের পুনর্বাসনের দ্রুত ব্যবস্থা করা উচিত। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট সংঘাত-সহিংসতায় আহত ও তাদের স্বজনদের চোখ-মুখে এখনো দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। আদতে আহতদের অনেকেই আর কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন কিনা তা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা।
এমন বর্বর আক্রমণের শিকার যারা হয়েছেন তাদের বাকি জীবন হয়তো এক ধরনের পঙ্গুত্ব শিকার করেই কাটাতে হবে। অনেকে হয়তো তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। এ পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত আহতদের দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। যারা এখনো গুরুতর অসুস্থ রয়েছেন তাদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও উচিত। যাদের আত্মত্যাগের ওপর রাষ্ট্র সংস্কারের সুযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের জীবন কিছুটা হলেও যেন সহজ হয় সেদিকে সরকারের নজর দিতে হবে। আহতদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে হাসপাতাল ছাড়ের ব্যবস্থা করে সেখানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।










