বাংলাদেশের খাদ্যবাজার মূলত কৃষি উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে খাদ্যমূল্য অস্থিরতা। তবে খাদ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আম বা তরমুজের সরবরাহ শৃঙ্খলে অনেক বিচ্যুতি দেখা যায়। যতই স্তর বাড়ে ততই দাম বাড়তে থাকে। অর্থাৎ একটি হাত পরিবর্তন মানেই কমিশন যুক্ত হওয়া এবং পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। পণ্যের দাম বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই অস্থিরতা দেখা যায়। আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় দুর্বলতা আছে। এর একটি হচ্ছে খাদ্য সংরক্ষণ। আমরা সংরক্ষণ বলতে বুঝি কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণ করা। বিশেষ করে যেসব মৌসুমি ফল হয়, সেগুলোর জন্য সংরক্ষণাগার তেমন নেই। ফলে কৃষকরা সঠিক দাম পান না। আমার কাছে মনে হয়, কিছু বিশেষ সংরক্ষণাগার তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্য শৃঙ্খল ঠিক রাখার জন্য খাদ্য সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তায় রাজনৈতিক দলের নেতাদের চাঁদাবাজির কারণেও পরিবহন ব্যয় বাড়ে, ফলে পণ্যের দামও বেড়ে যায়। সাভারের আমিনবাজার ও রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মধ্যে কয়েক কিলোমিটারের দূরত্ব, অথচ পণ্যের দামের ব্যবধান অনেক। তাই সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

জলবায়ু পরিবর্তনও আমাদের আরো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যার কারণে বন্যা, খরা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসছে। এমনিতেই আমরা জলবায়ু ঝুঁকিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। সেখানে কীভাবে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো যায়, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। সেখানে ব্যাংকের একটি দায়িত্ব এসে যায়। পরিবেশগত উন্নয়নে আমরা কাজ করছি।

আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে কৃষি ঋণ প্রদান করা। মার্চের যে ঋণের আউটস্ট্যান্ডিং থাকে তার আড়াই শতাংশ ব্যাংকগুলোকে দেয়া হয় কৃষি ঋণ প্রদানের জন্য। তুলা চাষকে কৃষিপণ্য হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হবে বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। যারা তুলা চাষ করবেন তারা ৪ শতাংশ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ পাবেন। বর্তমানে দেশে আমরা তুলা উৎপাদন করি দুই লাখ বেল। অথচ তুলার চাহিদা হচ্ছে ৮৫ লাখ বেল। তুলাকে কৃষিপণ্য হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে আমরা যদি তুলা চাষ করতে পারি, তাহলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব। কৃষি ও প্রাণিসম্পদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। কিন্তু সেগুলো ব্যবহার হচ্ছে না। এসব তহবিলের অনেক অর্থ পড়ে আছে। পুনঃঅর্থায়ন কীভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে আলোচনা দরকার। পুনঃঅর্থায়ন তহবিল কাজে লাগালে কৃষি উৎপাদন বাড়বে।

২০২৫ সালে বৈশ্বিক পণ্যের দাম কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। কারণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় মোটামুটি ভালো চাষাবাদ হয়েছে। আবার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও আছে। চিনির বাজার খুবই সংবেদনশীল।আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে রফতানি নিষেধ আছে, সেটি আমাদের সাহায্য করতে পারছে না। আমাদের মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে। যদিও খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে। এখন দেখার বিষয় সামনের সময়ে মূল্যস্ফীতিকে আমরা কীভাবে কমিয়ে রাখতে পারি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে খোলা ভোজ্যতেলের দাম ৭৫ শতাংশ কমেছে। রুই মাছের দাম ৬৮ শতাংশ কমেছে। ব্রয়লারের দাম ৬৩ শতাংশ কমেছে। আবার মুগ ডাল ও খাসির মাংসের দাম বেড়েছে। ভোক্তা অধিকারকে আমরা দেখি সাপ্লাই চেইনের শেষ প্রান্তে এনফোর্সমেন্ট করতে। এটা যদি সাপ্লাই চেইনের মধ্যবর্তী পর্যায়ে করা যায়, তাহলে ফলপ্রসূ হবে। দাম স্থিতিশীল থাকবে। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের ভূমিকা আরো বাড়াতে হবে। তথ্য-উপাত্ত আরো স্পষ্ট করতে হবে। উচ্চ ট্যারিফ বিষয়েও কাজ করা দরকার। আমাদের প্রতিযোগিতা অ্যাক্ট-২০১২ রয়েছে সেটিকে আরো উন্নত করতে হবে। আমরা বিভিন্নভাবে এনজিও, এমএফআই ও ফিনটেকদের সঙ্গে কাজ করেছি। যাতে করে ব্যাংক আরো তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। ব্যাংকের সমস্যা হলো প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছার মতো সক্ষমতা ও দক্ষ লোকবল নেই। ফলে বাড়তি সেবা দেয়া সম্ভব হয় না। আমাদের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে হয়। বাংলাদেশে অনেক ফিনটেক কোম্পানি উঠে এসেছে।

আমাদের প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে উদ্বৃত্তে আছি। ভারত যখন আমদানি বন্ধ করে দেয়, তখন শুধু আমরা কাজ করেছি। অবকাঠামো যদি উন্নত করতে পারি, তাহলে ব্যাংকও এগিয়ে আসবে। আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গ্রাহকের কেওয়াইসি। যারা টাকা নিচ্ছে তাদের কাছ থেকে টাকা ফেরত পাব কিনা সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এরই মধ্যে ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। আগামীতে দেখা যাবে, কিছু ব্যাংক ঋণ দিতে পারছে না। ব্যাংক খাতসহ সব ক্ষেত্রে যেন সুশাসন কার্যকর হয়, সরকারকে সেদিকে নজর দেয়া দরকার। কেননা অনেক ব্যাংকের কৃষকদের ঋণ দেয়ার সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ শুধু সংখ্যাগত নয়, বরং এটি সত্যিকার অর্থেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমরা যদি জবাবদিহিতা, বাজারে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনতে পারি, তাহলে খাদ্যের বাজারে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো অনেকাংশে চিহ্নিত করে সমাধান করতে পারব।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি

[বণিক বার্তা আয়োজিত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের ‘খাদ্যের বাজার, সরবরাহ ও দেশজ সক্ষমতা’ বিষয়ক অধিবেশনে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]