দেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমান। অভিবাসী কর্মীদের পাঠানো আয় দেশের অর্থনীতির গতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিদেশের শ্রমবাজার সবসময় অভিবাসীদের জন্য নিরাপদ হয় না। অনেক সময় অপঘাতে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। আবার বিদেশ থেকে মরদেহের সঙ্গে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর’ সনদ এলেও দেখা যায় শরীরে নানা আঘাতের চিহ্ন। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে প্রবাসে মৃত্যুবরণকারীদের ৩১ শতাংশের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ১৬ শতাংশের মৃত্যু হয় দুর্ঘটনায়। আর ১৫ শতাংশ আত্মহত্যা করেন। ২৮ শতাংশের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। বাকিরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। যদিও প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুসনদে থাকা কারণ নিয়ে সন্তুষ্ট নয় তাদের পরিবার।

প্রবাসে মৃত্যুবরণ করা কর্মীদের পরিবারের ৪৮ শতাংশ মনে করে, তাদের স্বজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ডেথ সার্টিফিকেটে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা সঠিক নয়। এ তথ্যও উঠে এসেছে ২০২২ সালে রামরু পরিচালিত এক গবেষণায়। এর পেছনে রয়েছে মরদেহে ক্ষতচিহ্নের পাশাপাশি মৃত্যুর আগে মুঠোফোনে অস্বাভাবিক আলাপ, চিকিৎসার তথ্য না থাকা ইত্যাদি কারণ। যে কারণে প্রবাসে স্বজনের মৃত্যুর যথাযথ কারণ জানতে চাওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

এদিকে প্রতি বছরই প্রবাসে অভিবাসী মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল রেকর্ড সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৮১৩টি মরদেহ দেশে ফেরত আনা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৫২। আবার মৃতদের গড় বয়স মাত্র ৩৭ বছর। রামরুর সাম্প্রতিক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে প্রবাসে যারা মারা যান, তাদের মধ্যে ৩১ শতাংশের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ৫৬ হাজার ৭৬৯ প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে, যা খুবই উদ্বেগজনক। প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে সরকার কতটা তৎপর কিংবা আদৌ সেই দেশকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয় কিনা। কিংবা প্রবাসী কর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা ও যাপনের মানোন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে কিনা। এক্ষেত্রে আসলে রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রবাসী বাংলাদেশীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মৃত্যুর পর মরদেহের সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় ও মৃতের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা—এসব রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এসব দায়িত্বের পরিপালন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয় না। যে কারণে প্রায়ই দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য-সুস্থতা রক্ষার চর্চা না থাকা, শারীরিক নির্যাতন, তাপ ও বায়ুদূষণের মাঝে বৈরী পরিবেশে কাজ করে শারীরিক-মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও জটিল কিডনি রোগে আক্রান্তের খবর আসে। তাছাড়া প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর পরিসংখ্যানও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ঘাটতিকেই নির্দেশ করছে।

সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদেশে কর্মরত প্রবাসীদের সুরক্ষায় উদ্যোগী হতে হবে। সেই সঙ্গে দেশে ফেরত আসা মরদেহের সঙ্গে থাকা মৃত্যু সনদের তথ্যের সত্যতা যাচাই করা আবশ্যক। দূতাবাস ও সরকারকে আন্তর্জাতিক মৃত্যুসংক্রান্ত প্রটোকল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বিনিময়ের জন্য দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের দিকে এগোতে হবে প্রয়োজনে। এ ধরনের চুক্তি থাকলে বিদেশে অভিবাসীর মৃত্যুর প্রকৃত তথ্য প্রাপ্তি, তদন্তের স্বচ্ছতা ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের পথ সুগম হতে পারে। এছাড়া মৃত্যুর প্রকৃত তথ্য জানতে দেশে ফেরত আসা মরদেহের সুষ্ঠু ময়নাতদন্ত হতে হবে। কারণ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা না গেলে কোন শ্রমবাজার কর্মীদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ তা জানা সম্ভব হবে না এবং প্রতি বছর মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। আবার যেসব দেশে বাংলাদেশী অভিবাসীদের মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি, সেসব দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে মৃতের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রবাসে আত্মহত্যাকারীদের সংখ্যাও কম নয়। কোন প্রেক্ষাপটে কর্মীরা এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারও সুষ্ঠু অনুসন্ধান জরুরি। অভিবাসনের মানসিক চাপ, কাজের অমানবিক পরিবেশ, নিপীড়ন, চুক্তি লঙ্ঘন এবং দালাল চক্রের প্রতারণার কারণে অনেক সময় প্রবাসে কর্মীরা আত্মঘাতী হয়ে ওঠেন। এমন প্রেক্ষাপটে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি যথাযথ প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থানে কাজের চুক্তির স্বচ্ছতা, বৈধভাবে বিদেশ গমন, দূতাবাস ও রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির তদারকি জোরদার করা দরকার। তাছাড়া এভাবে প্রবাসে মৃতের সংখ্যা ও রহস্যজনক মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকলে সেটি জনগণকে অভিবাসনে নিরুৎসাহিত করবে। এছাড়া প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত আরেকটি মৌলিক সমস্যা হলো ঢাকার বিমানবন্দরে তাদের মরদেহ অপমানজনক ও অসংবেদনশীলভাবে ব্যবস্থাপনা করার অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, মরদেহ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতে ৮০ শতাংশ পরিবারকে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব জটিলতার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। এজন্য দূতাবাস ও কনস্যুলেটদের আরো সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, অভিবাসীর মৃত্যুর পর দূতাবাস প্রয়োজনীয় তদন্ত করে না, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিবেদন সংগ্রহ করে না বা পরিবারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ রক্ষা করে না। এ কারণেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে পরিবারের সদস্যরা অবগত হতে পারেন না অথচ এ দূতাবাসগুলোই হতে পারে প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনের সুরক্ষা বলয়।

সরকারের উচিত অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যুকে ঘিরে প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। অভিবাসীদের মৃত্যুর বিশ্বাসযোগ্য তথ্য, মরদেহ যথাযথ সম্মানের সঙ্গে দেশে ফেরত আসা ও পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতা—এসব নিশ্চয়তা দিতে না পারলে দেশের অভিবাসন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন সম্ভব হবে না। প্রতি বছর প্রবাসে কর্মীর মৃত্যুর হার বাড়তে থাকবে।