ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল নগরী। বাংলাদেশের রাজধানীটি জনসংখ্যায় বিশ্বের সব শহরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কাছাকাছি পৌঁছলেও উল্টো চিত্র জীবনমানে। নাগরিক সেবা, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা—সব সূচকেই তলানিতে। অপ্রতুল নগর সুবিধা, অপরিকল্পিত আবাসন, অসহনীয় যানজট, পরিবেশ দূষণ ও মৌলিক সেবাপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তা মিলিয়ে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই কঠিন ও অনিরাপদ হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরেই পরিকল্পিত রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তুলতে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সেগুলোর বেশির ভাগই ফলপ্রসূ হয়নি। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রণহীন উন্নয়নসহ কর্মসংস্থান ও সেবার ঢাকাকেন্দ্রিক প্রবণতা শহরটিকে ধীরে ধীরে বাসযোগ্যতার বাইরে ঠেলে দিয়েছে। ঢাকার জীবনমানে উন্নয়ন ঘটাতে হলে পরিকল্পিত নগরায়ণ অপরিহার্য।

জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্সের তৈরি করা ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর এখন জাকার্তা। এর পরই ঢাকার অবস্থান। এ শহরে এখন ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বাস করে। বর্তমান বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ জনসংখ্যায় শীর্ষ নগরী হয়ে উঠবে ঢাকা। তখন এ শহরের জনসংখ্যা হবে প্রায় ৫ কোটি ২১ লাখ।

শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, সমাজ-সংস্কৃতির কেন্দ্র হওয়ার কারণে ঢাকায় জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি হচ্ছে উচ্চহারে। সীমিত জায়গায় বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস হওয়ায় নগরীর আবাসন, যোগাযোগ, স্যানিটেশন, পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ আনুষঙ্গিক সব অবকাঠামোই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। নগরসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশি মানুষের শহর হলেও সঠিক নগর পরিকল্পনা থাকলে বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু ঢাকার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই সে সুযোগ নষ্ট হয়েছে।

বাসযোগ্য শহর গড়ার ক্ষেত্রে পরিকল্পিত ও নিরাপদ আবাসন একটি প্রাথমিক শর্ত। খোদ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ঘোষণা করেছে, নগরীটির ৯০ শতাংশ ভবনই কোনো না কোনো নিয়মের ব্যত্যয় করে গড়ে উঠেছে। এর অর্থ হলো নগর পরিকল্পনা, বিল্ডিং কোড, ভূমি ব্যবহার নীতিমালা ও নিরাপত্তা মানদণ্ড প্রায় কোথাও ঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ভবনের নকশা অনুমোদন না নেয়া, অনুমোদিত নকশা ভঙ্গ করে বাড়তি তলা নির্মাণ, জমির ব্যবহার পরিবর্তন, পর্যাপ্ত রাস্তা ফুটপাত বা খোলা জায়গা না রাখা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা, প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় না রাখা—এ ধরনের নানা অনিয়মে শহরটি ভরে গেছে। এক্ষেত্রে রাজউকের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করছে।

ঢাকা শহরের বিদ্যমান ভবনগুলো ভূমিকম্প ও অগ্নিদুর্যোগ সহনশীল কিনা সে বিষয়ে কোনো সমীক্ষা নেই। যদিও বেসরকারিভাবে বলা হয়, এ শহরের ২১ লাখ ভবন ভূমিকম্পের তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে মানুষকে বাধ্য হয়েই অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাস করতে হচ্ছে। তাছাড়া জনবহুল নগরী হওয়ায় নাগরিক পরিষেবা পেতেও পদে পদে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তীব্র যানজটে কমেছে শহরের মানুষের গতি। ঢাকার ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় সেটিও পথচারীবান্ধব নয়।

বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর হিসেবে পরিচিত ঢাকা। যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, নির্মাণকাজ এবং শিল্প-কারখানার বর্জ্য বায়ুদূষণের প্রধান কারণ। বায়ুদূষণের ফলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ক্যান্সারসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালুর মতো নদীগুলোয় বর্জ্য ও শিল্পবিষাক্ত পদার্থ ফেলা হচ্ছে নিয়মিত। স্যুয়ারেজ ও অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ায় দূষিত হচ্ছে পানি। এতে জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে এবং বিশুদ্ধ পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে। অতিরিক্ত যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজ ও জনবহুল এলাকার কোলাহলে শব্দদূষণ মারাত্মক মাত্রায় পৌঁছেছে। নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ঢাকায় শব্দদূষণ অনেক বেশি। ফলে মানসিক চাপ, শ্রবণশক্তি হ্রাস ও শিশুদের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ঢাকা শহরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ঘরোয়া, বাণিজ্যিক ও চিকিৎসা বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ, পরিবহন করা হয় না। বর্জ্য স্তূপে জীবাণু ছড়ানো, মশা-মাছির বিস্তার এবং পচা গন্ধ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে। অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে উন্মুক্ত মাঠ, বৃক্ষ ও উদ্যান হারিয়ে যাচ্ছে। এটি শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বাতাসের বিশুদ্ধতা হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নালা-নর্দমার দখল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটিই মূল কারণ। এতে যানজট বাড়ছে, জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে ও পানিবাহিত রোগ ছড়াচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও নজরদারির অভাবে পরিবেশ সংরক্ষণে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের অন্যতম নজির ঢাকা। যে কারণে শহরটি যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত হওয়া সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের কারণে ঢাকার ঝুঁকির বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে। সম্প্রতি ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকার বহু ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। হেলে পড়েছে অনেক বহুতল ভবন। এমনকি ভবনের রেলিং ও দেয়াল ধসে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এ দেশের ইতিহাসে প্রতি ১০০-১৫০ বছর অন্তর বড় ভূমিকম্পের নজির রয়েছে। উপরন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ক্রমাগত ছোট-মাঝারি ভূমিকম্প দেখা দিচ্ছে, যা বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাসও বটে। আবার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল ঢাকার অদূরে। যে কারণে ঢাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কেননা ঢাকার বেশির ভাগ ভবন বিল্ডিং কোডের বিধি না মেনেই নির্মাণ করা হয়েছে। আবার হাজার হাজার ভবন দাঁড়িয়ে আছে ভরাট জলাভূমি, বালুমাটি ও দুর্বল মাটির স্তরের ওপর। কোথাও কোথাও ভবনের গভীর ফাউন্ডেশন নেই, অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে বহু ভবন। আবার অনুমোদনের বাইরেও গড়ে তোলা হয়েছে বহু ভবন। যে কারণে ভবনগুলোর বেশির ভাগই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

ঢাকা বর্তমানে যে সংকটে রয়েছে তা আকস্মিকভাবে সৃষ্টি হয়নি, বহু বছরের নীতিগত ভুল, অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলেই গড়ে উঠেছে। এখনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেয়া গেলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে কর্মসংস্থান ও সেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করাও অত্যন্ত জরুরি। সব ধরনের কর্মসংস্থান, শিল্প-কারখানা, শিক্ষা,–স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি দপ্তর বিভাগীয় শহর, জেলা-উপজেলায় গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষ নিজ এলাকার মধ্যেই কাজ ও সেবা পায়। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ থামিয়ে সঠিক ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা কার্যকর করতে হবে, যাতে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চল আলাদা ও পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে রাজউকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রাজউকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, ঘুস-দুর্নীতি ছাড়া এখানে কোনো কাজ হয় না। ফলে সংস্কারের মাধ্যমে রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজউক গড়ে তোলা না গেলে ঢাকাকে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তোলা অসম্ভব।