গত মাসে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) মানব উপস্থিতি ২০ বছর পূর্ণ হলো। আর এ স্টেশনে অবস্থানরত মহাকাশচারীদের জীবনযাত্রা আরো সহজ ও উন্নত করতে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। উদ্ভাবন করছেন নতুন নতুন প্রযুক্তি।

মহাকাশচারীদের লক্ষ্য করে এসব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হলেও এর মধ্যে অনেক প্রযুক্তিই কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও সহজ করে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মহাকাশচারীদের ঘুমের সমস্যা এড়াতে উদ্ভাবন করা এলইডি লাইট প্রযুক্তি বাড়িতে ব্যবহারের উপযুক্ত করে তোলা হয়েছে। আবার ওজনশূন্য অবস্থায় নভোচারীদের ফিট রাখতে একটি ভারোত্তলন ব্যবস্থা বাড়িতে ব্যায়ামের কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে। 

এ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন হলো পানি পরিশোধন ব্যবস্থা। আইএসএসের জন্য তৈরি এ পানির ফিল্টার পৃথিবীর সুপেয় পানির সংককে থাকা অঞ্চলগুলোতে ব্যবহার করা যেতে পারে। 

এই পরিশোধন প্রযুক্তি ব্যবহার করে মহাকাশ স্টেশনে পরিবেশের আর্দ্রতা থেকে শুরু করে মহাকাশচারীদের প্রস্রাবের প্রতিটি ফোঁটা পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করতে হয়। নতুন প্রযুক্তি দিয়ে সহজেই সেটি করা যায়। তবে বর্তমান পরিশোধন ব্যবস্থাটি বেশ জটিল। প্রতি ৯০ দিন পরপর এটি পরিবর্তন করতে হয় এবং ব্যবস্থাটি নির্দিষ্ট কিছু উপাদান ফিল্টার করতে পারে না বলে জানিয়েছে নাসা। 

ডেনিশ সংস্থা অ্যাকোয়াপোরিন এ/এস একটি নতুন পানি পরিশোধন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এটিতে অ্যাকোয়াপোরিন নামে প্রোটিন ব্যবহার করা হয়। 

সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিটার হোম জেনসেন ব্যাখ্যা করেন, এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যা পানিকে জীবন্ত কোষের কোষঝিল্লি অতিক্রম করতে দেয়। প্রকৃতিতে এই প্রোটিনের মাধ্যমে উদ্ভিদের শিকড় মাটি থেকে পানি শোষণ করে এবং এই পদ্ধতিতেই মানুষের কিডনি (বৃক্ক) প্রতিদিন প্রায় ১৭০ লিটার তরল ফিল্টার করে। এ প্রোটিন নির্দিষ্ট দূষণকারী পদার্থগুলোকে আটকে দেয়। 

মহাকাশে এ ব্যবস্থাটিকে পরীক্ষা করে নাসা তাদের বর্তমান ব্যবস্থাটিকে প্রতিস্থাপনের বিষয় বিবেচনা করছে। পাশাপাশি সুপেয় পানির সংকট দূর করতেও সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে ব্যবস্থাটিকে ভাবা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ২০০ কোটিরও বেশি মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। আবার উন্নত দেশগুলোতে অনেক মানুষ ট্যাপের পানির বিশুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহ করে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ তাদের সরবরাহকৃত পানির গুণমান নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং ইউরোপীয়দের মধ্যে কেবল ৫৫ শতাংশ মানুষ ট্যাপ থেকে সরাসরি পানি পান করেন।

অ্যাকোয়াপোরিনের প্রযুক্তি এক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। অ্যাকোয়াপোরিন ডেনমার্কের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিআইওএফওএস ও হাঙ্গেরির ইউটিবি এনভায়রোটেকসহ বর্জ্যপানি নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। তারা মূলত সমুদ্রে মিশ্রিত হওয়ার আগে বর্জ্যপানি থেকে মাইক্রোপলুট্যান্টস (ক্ষুদ্র দূষণকারী উপাদান) ও মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলো অপসারণ করে। 

বিআইওএফওএস’র পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, অ্যাকোয়াপোরিনের প্রযুক্তি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিগুলোর তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পানি থেকে ৯৫ শতাংশেরও বেশি মাইক্রোপলুট্যান্টস ও মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করতে পারে। 

গবেষণাটিতে নেতৃত্ব দেয়া বিআইওএফওএস ইনোভেশন ম্যানেজার ডাইনস থমবার্গ বলেন, এ প্রযুক্তির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। আমি মনে করি বর্জ্যপানি থেকে পরিষ্কার ও সাশ্রয়ী মূল্যে সুপেয় পানির জন্য অ্যাকোয়াপোরিন সিস্টেমটি নেতৃত্ব দিতে পারে। আমি সত্যই আশাবাদী, এ প্রযুক্তি দিয়ে আমরা বিশ্বের অনেক অঞ্চলে পানির ঘাটতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারি। 

সংস্থাটির সিইও জেনসেন দেশীয় পানি পরিশোধন বাজারে প্রবেশের সুযোগও পেয়েছে। একটি হিসাব মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে খাতটির বাজার দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। 

গত মাসে অ্যাকোয়াপোরিন এ/এস বাড়ির সিঙ্কের নিচে পানি পরিশোধন সিস্টেম চালু করেছে। এটি বিদ্যুৎ ছাড়াই কাজ করে। সিস্টেমটিতে খরচ হয় ৬৫০ ইউরো। সংস্থাটি বর্তমানে ইউরোপীয় বাজারকে টার্গেট করেছে। পরের দুই বছরে এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং এরপরে ভারত ও চীনে প্রসারিত করার পরিকল্পনা করছে। 

উত্পাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো বিশুদ্ধ পানির সংকটপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা। জেনসেন বলেন, আমি সত্যই বিশ্বাস করি, আমরা একটি পরিবর্তন আনতে পারবো।

সিএনএন অবলম্বনে