একটু একটু করে ভোর হচ্ছে। বাইরে হেমন্তের শেষ শীত। আলো নিভিয়ে পর্দা সরাতেই দেখি কুয়াশার বুকচিরে সূর্যের চিকন আলো উঠে আসছে। ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে রাস্তার ওপারের বার্চ ও খয়েরি বৃদ্ধাশ্রম। ঝুলে আছে লাইট পোস্টের বাতি সেক্সপিয়রের সনেট তিয়াত্তরের অটামের মরা হলদেটে শেষ পাতাটির মতো। কুয়াশায় তার মুখখানাও আবছা। পৃথিবীর যেখানেই থাকি না কেন এরকম ঘন কুয়াশা দেখলে গায়ে শীত শীত লাগলে আমার স্মৃতি খুলে যায়। আর তার পুরোটা তাজা খেজুরগাছের রসের ঘ্রাণে ম ম করে।

প্রায় ছয় দশক আগের কথা। স্কুলের ছুটিতে যখন মুরুজপুর গ্রামের বাড়ি যেতাম মৌলভীবাজার থেকে ছোট্ট নৌকা করে মনু পেরিয়ে হাঁটাপথ ধরতে হতো। দাদার বাড়ি দৃশ্যমান হয়ে উঠার আগেই সবার আগে দেখা যেত পুকুর ঘাটের পুরনো দুই খেজুর গাছ। পরদিন ঘুম ভাঙলেই মাটির কলসি ভরা রস নিয়ে আসতো ইয়াস পুতি। সুমিষ্ট সেই রস খেতে খেতেই রান্নাঘর থেকে ভেসে আসতো পিঠার জন্য রস ঘন করার সুগন্ধ। শুনতে পেতাম চাল গুঁড়ো করার ঢেঁকির শব্দ। তাড়াহুড়া করে নিমের মাজনে দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে বেতের হাতে বোনা নকশি করা পাটিতে খদ্দরের চাদরে গা মুড়ে চুলোর ধারে বসেই খেতাম গরম গরম পিঠা। বাসন ভরে উঠতো পিঠায়। কত রকমের যে পিঠা হতো! আমাদের গ্রাম বাংলার গরুর খাটি দুধ আর খেজুরের ঘন রসে ডুবে থাকা পিঠার কথা মনে করতে করতেই বারান্দা থেকে ঘরে প্রবেশ করলাম। বিলেতের শীতে এতক্ষণ বাইরে থাকা যায় না। 

ভেতরে এসে কফির জল গরম করতে করতে মনে হল মহান শিল্পী এসএম সুলতানের আঁকা বিশালাকৃতির ক্যানভাসে দেখা আমাদের সম্পন্ন ও ঋজু গ্রাম বাংলার কথা। তার সেই অসাধারণ ছবি যেটাতে সরষে রঙা রোদ আর স্বাস্থ্যবতী বাঙালি রমনী পিঁড়িতে বসে বাঁকানো বটি দা’য়ে মাছ কাটছেন তার কথা মনে হল।  আমার ছোটবেলায় তখন শুধু গ্রামে নয় মফস্বল শহরেও কি এক ধরেনের পবিত্রতা ছিল। আনন্দগুলো ছিল হিন্দু-মুসলমানের মিলিত অরগ্যানিক আখ্যান। নানান আনন্দ আয়োজনের ফাঁকে আজান, কাঁসর ঘণ্টা, নাড়ু ও নামাজ আসা যাওয়া করতো পরম্পরায়। মেঝমামার কর্মস্থান পটিয়ায় হ্যাজাক বাতির আলোয় তাঁবুর নিচে সবাই জাম্পেস করে দেখেছি রূপবান যাত্রা। দিনের শেষে আমার ভীষণ গল্পবই পড়ুয়া নানীর কাছে গল্প শুনে বা মায়ের গুনগুনানিতে লালাবাই বা ঘুম পাড়ানি গান শুনে ঘুমিয়ে পড়েছি। সেখানেও চিত্রকল্প থাকতো মাছ কাটলে মুড়ো, ধান ভানলে গুঁড়ো আর গাঈ বিয়োলে দুধের কথা।

স্মৃতি বড় ছোঁয়াচে ও দূরন্ত গতি সম্পন্ন। এক স্মৃতি মনে হওয়া মাত্র সে দেশ কাল পাত্র টপকে আরেক স্মৃতিকে ছুঁয়ে দেয় বা টেনে ধরে। সেটি আরেক জায়গার আরেকটিকে। এদেরকে কালের তকমায় আটকে ফেলতে চাওয়া এক মুর্খামি ছাড়া কিছু না। তাই জীবন বুড়ি ছোঁবো বলে বাংলাদেশের গ্রামীণ বা লোক সংস্কৃতি সাহিত্যের কথা আমাকে বিলেত থেকে ছুটিয়ে নিয়ে যায় সেখানে। এখানে তিন দশক হয়ে গেলেও। ভাবা যায়?

বাবা আবু আহমদ মাহমুদ তরফদার শুধু সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন না, ছিলেন সংস্কৃতি ও শিল্প সেবী। তাই বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা শহরে চাকরি সূত্রে ঘুরে বেড়াবার সময় আমি বিভিন্ন স্থানের চিত্তাকর্ষক আয়োজন ও উদযাপনের সুযোগ পেয়েছি। জাতিসত্তা ও আত্মসত্তার ভেতরে ধর্ম নিরপেক্ষতা গাঢ়ভাবে প্রোথিত হয়েছে। উপলব্ধি করেছি আমাদের লোক বা গ্রামীণ সংস্কৃতি কতটা সর্বজনীন। শিল্প সাহিত্য, আহার আচরণ, সংগীত স্বাদ- সবই। বলি খেলা থেকে মোরগের লড়াই, পুঁথিপাঠ থেকে ধাঁধাঁ, ব্রতচারি নৃত্য থেকে ধামাইল। ভাটিয়ালী ভাওয়াইয়া, মুর্শিদী ও কীর্তন, জারি সারি সবই ধ্বনিত ও গীত হতো নৌকাবাইচ, পূজা, সিন্নি ও বিবাহায়জনে। গান করে করে এক ধান থেকেই তৈরি হত চাল, চিড়া, খই, মুড়কি, করই, মুড়ি, পিঠা, খুঁদ, মোয়া, উড়কা। হত মূল উপাদান চাল থেকেই শত রকমের পিঠাপুলি ও খাবার। মেলায় পাওয়া যেত হাতে বানানো মাটির রবীন্দ্র ও নজরুল। নাগর দোলা দুলে এসে মানুষ কিনতো হাতপাখা, কাঁথা, একতারা দোতারা, বটি, মাটির হাঁড়ি পাতিল। কখনো হাত ঘেমে  গলে গেছে মুঠোয় ধরা গেছে মেলায় কেনা সোনালী বাতাসা বা শংখের মতো সাদা নকুল দানা ও রস কদম। 

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানের কথা যদি ধরি তবে আমার অভিজ্ঞতা তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ না হলেও নেহায়েত নগণ্য না। সিলেট, সন্দ্বীপ, চাটগাঁ, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, জামালপুর, নোয়াখালি এবং আরো দু’একটা জায়গা- বাংলাদেশের সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের কাহিনী বলার জন্য এ পরিসর ও পর্যাপ্ত না। লিংগুয়াফ্রাঙ্কা বাংলা ভাষা হলেও দেশের প্রতিটি স্থানে নিজস্ব উপভাষার একটা ব্যাপার ছিল। কোথাও কোথাও ছিল নিজস্ব ডায়ালেক্ট। নিজেদের অনুষ্ঠান ও তার প্রদর্শনে লোকসংস্কৃতি থেকে উঠে আসা লোকনাট্য, লাঠি খেলার সঙ্গে লাঠি নাচ, খেমটা গানের সঙ্গে খেমটা নাচ এবং ঘাটু গানের সঙ্গে ঘাটু নাচ ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এসব ফুঁড়ে উঠে এসেছে ময়মনসিংহ গীতিকা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গম্ভিরা, ছড়া, ধাঁধা, মন্ত্র, প্রবাদ-প্রবচন, পালা, কবির লড়াই প্রভৃতি। হোলির গীত, গাজীর গীত, মাগনের গীত, বিবাহের গীত প্রভৃতি লোকসংস্কৃতির আনুষ্ঠানিক প্রকাশগুলো হত আয়জন করে। হত বলছি, কারণ এখন আর তা হয় না। হস্তশিল্প লোকসংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ ভুবন। বেতশিল্প, বাঁশশিল্প, কাঠশিল্প, চামড়াশিল্প, বুননশিল্প বিশেষ করে মসলিনের যুগ পেরিয়ে আজকের জামদানি সবই লোকশিল্পেরই অবদান। এতে শিল্পী মনেরপ্রকাশ পেয়েছে প্রতিটি দশকে। কিন্তু বিবর্তনের ধারায় তা এখন এত ভিন্ন হয়ে গেছে যে কোন কোন সময় তার উৎসের সঙ্গে যোগটা একটা গবেষণারই ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখন তা নগর সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গেছে। কেবল মাত্র আয়োজন ছাড়া তা আর প্রতীয়মান হয় না। মাটির জায়গায় প্লাস্টিক, চটের জায়গায় পলিথিন, মাটির গহনা, বেলোয়ারি রেশমী চুড়ির স্থানে এসেছে অক্সিডাইজড গহনা। নগরসংস্কৃতির সুবিধার নামে শাড়ি, ধুতি উবে গেছে। গামছার স্থানে তোয়ালে, নিমের মাজনের বদলে টুথব্রাশ আর মেয়েদের বেনীতে সুতির কালো ট্যাসেলের জায়গায় এসেছে প্লাস্টিকের চুল বা উইগ। 

পাহাড়পুর-ময়নামতির পোড়ামাটির ফলকে হাজার বছর আগে আমাদের যে শাড়ির প্রচলন ছিল তার প্রমাণ আছে। কিন্তু মাত্র কয়েক দশকেই কর্মজীবী নারীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষ করে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ হওয়া পর শাড়ি হয়ে গেছে পার্টির পোশাক। বৈশাখী, বসন্ত গানের ও রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী, একুশের অনুষ্ঠান ছাড়া শাড়ি খুব কম দেখা যায়। মেয়েরা শাড়ি পরতেও ভুলে গেছেন। কেউ কেউ এখন বিউটি পার্লারে গিয়ে অন্যের হাতে শাড়ি পরে তবে অনুষ্ঠানে যান। পুরুষদের গায়েও এখন চড়ে বসেছে সার্বক্ষণিক জিন্স ও টি-শার্ট। আগে যেভাবে স্থানিক চেহারা ছিল তা এখন বৈশ্বিক। এই এরাই উনিশ শতকের শেষের দিকে ইংরেজদের মতো করে ব্যাপকভাবে গ্যালেস লাগানো কোট প্যান্ট পরা শুরু করেছিলেন৷ 

অনুষ্ঠানে নেই আর পুঁথিপাঠ, কবির লড়াই। আছে অনবরত কবিতা পাঠ, বৃন্দ কবিতা পাঠ, নাচের সঙ্গে কবিতা। কখনো সে কবিতা সিডিতে বাজে, হয় অনলাইনে। হাতে ধরে বই পড়া উঠে যাচ্ছে, এসে যাচ্ছে ই-বুক বা অডিও বুক। এখন গাড়ি চালাতে চালাতে বা ট্রেনে বাসে চলতে চলতে কানে শোনা যায় হুমায়ুন আহমেদের দেবী বা বেঞ্জামিন জাফানায়ার কবিতা। কবিরাও কবিতা পাঠ করেন না- করেন কবিতা পারফরমেন্স। এখন জন্মদিনে হায়ার করে আনা হয় স্টোরি টেলার, ক্লাউন ও ম্যাজিশিয়ান। হয়তো একদিন আমাদের পুঁথিপাঠ, কবির লড়াই এগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছাড়া আর কোনো খবরই থাকবে না। 

বছর কয়েক আগে গ্রামের বাড়িতে দিয়ে দেখি ঢেঁকি নেই। সুন্দর প্লাস্টিক প্যাকেটে করে আসছে চালের গুঁড়ো। এখন সে গুঁড়ো লন্ডনের ব্রিকলেন বা রোমান রোডের বাঙালি দোকানে পাওয়া যায়। শুধু চালের গুঁড়োই নয় পাওয়া যায় তৈরি ফ্রোজেন পুলি পিঠা, মেরা পিঠা ও চালেরগুঁড়োর রুটি।  

ধরে নিলাম বৈশ্বায়নের কারণে আমাদের সংস্কৃতির এ পরিবর্তন, সাহিত্যের এ নবায়ন অপরিহার্য। এগুলোর এ বিবর্তন না হলে এগুনো ব্যাহত হতো। এতে বাঙালির জীবনযাপন স্মার্ট ও  উন্নত হয়েছে। তবু আমার যে বুকটা চিন চিন করছে তার কারণ কী? সে কি আমার নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতির উপমা হারিয়ে যাচ্ছে বলে নাকি আমাদের সমষ্টিগত আত্মবিক্ষণে সংযোগ হারিয়ে ফেলছি বলে। আচ্ছা হলোই-বা তা। এতে ক্ষতির সম্ভাবনা কোথায়? আমার ধারণা নিটোল বর্তমান নিয়ে ভাবলে জাতি হিসেবে আমাদের আত্মপঅরিচয় বিঘ্নিত হবে, লুপ্ত হবে। কেউ কেউ ভাবতে পারেন তারও কি কোনো দরকার আছে? ইমোশনের কারণে কিছু ধরে রাখা কি ঠিক? এনিয়ে অনেক ভেবেছি। বাস্তবে চলতে গিয়ে আরো স্পষ্ট করে বুঝেছি ও দেখেছি অন্যের কাছে এর দাম। আছে দাম এক মানুষ থেকে আরেক মানুষের ছায়া আলাদা করে দেখবার। জীববৈচিত্র্য যেমন জীবের টিকে থাকার জন্য জরুরি। তেমনি মানুষের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বৈচিত্র্য ও তাদের মনের স্থিতিশীলতার জন্য সমান জরুরি এবং সে বৈচিত্র্যে ধারাবাহিকতা রাখাটা তার চেয়ে আরো জরুরি। 

পৃথিবীর সব জাতি সব গোষ্ঠীর শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিরই পরিবর্তন হয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতিও সেই পথ ধরে চলছে। শত বছর আগের বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে আজকের বাঙালি সংস্কৃতির মিল থাকবে না সেটাই স্বাভাবিক। তবে পরিবেশন যোগ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আমি সমর্থন করি। এগিয়ে যাওয়া অনেক জাতির কাছে ঐতিহ্যের দাম কমেনি- বরং বেড়েছে বলে দেখেছি। আর তা টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের মিউজিয়াম, ঐতিহ্যধারী অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য রাষ্ট্রীয় অনুদান, আর তা আরকাইভ করার জন্য এখানের  ব্রিটিশ লাইব্রেরির কি অসামান্য আয়োজন লক্ষ্য করেছি!  

এই কভিডকাল শুরু আগে এ বছরের গোড়ার দিকে শান্তি নিকেতনে গিয়েছিলাম। সেদিনের দুপুরটা ছিল একদম নিরাকপরা। আর কোপাই নদীর পাড়ে একটি বৃক্ষের নিচে দেহাতি এক গায়ক আপন মনে গান গাইছিলেন। তার গানের কথা ও সুর ছড়িয়ে যাচ্ছিল বহুদূর। তিনি  গানের সঙ্গে বাজাচ্ছিলেন দেশী বাদ্যযন্ত্র। হয়তো তা তারই তৈরি। তবে গানের কথাগুলোই বেশি মনে পড়ছে। সে হলো, তোমায় হৃদমাজারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না/ ওরে ছেড়ে দিলে সোনার গৌড় আরতো পাবো না। আমাদের বাংলাদেশের লোক বা গ্রামীণ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিই আমাদের ঠিকুজী, আমাদের সোনার পঙ্খী। তা ছেড়ে দিলে আরতো পাবো না। সুতরাং ছাড়া যাবে না।

শামীম আজাদ, লন্ডন