কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মানববিদ্যার অধ্যাপক ব্রুস রবিনস ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান দমন-পীড়নের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, তিনি নিজেও ‘সিংহের খাঁচায় নিক্ষিপ্ত’ হওয়ার শঙ্কা করছেন।
তিনি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের রিয়েল টক অনুষ্ঠানে বলেন, কোনো অপরাধ না করেও একজন ব্যক্তিকে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর সামনে থেকে গ্রেফতার করা এবং লুইজিয়ানায় পাঠানো—এটি এক ভয়ংকর চিত্র।
সম্প্রতি কলাম্বিয়া থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী মাহমুদ খলিলের গ্রেফতার প্রসঙ্গে তিনি এ মন্তব্য করেছেন। গত ৮ মার্চ নিউইয়র্ক সিটি থেকে রাতের খাবার খেয়ে ফেরার সময় খলিলকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস)। সংস্থাটি জানিয়েছে, ট্রাম্পের ইহুদিবিদ্বেষ নিষিদ্ধকরণে নির্বাহী আদেশের অধীনে তাকে আটক করা হয়েছে।
অধ্যাপক রবিনস বলছেন, মাহমুদ খলিল কোনো অপরাধ করেননি। তিনি শুধু তার বাকস্বাধীনতা প্রয়োগ করেছেন। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো উচিত ছিল।
২০২৪ সালে ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ নতুন মাত্রা পায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধকালীন আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় শিক্ষার্থীরা সাময়িক অস্ত্রবিরতির আহ্বান জানাতে ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইসরায়েলি যুদ্ধের প্রতি সম্পৃক্ততার বিরুদ্ধে ক্যাম্প স্থাপন করে।
কিন্তু বাইডেন প্রশাসন এসব বিক্ষোভের সমালোচনা করে সন্ত্রাসবাদের সমর্থন ও ইহুদিবিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ আনে।
অক্টোবরের মধ্যে ৬০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ফেডারেল তদন্তের মুখে পড়ে, যার মধ্যে কলাম্বিয়া অন্যতম। এছাড়া, বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ধনী দাতাদের চাপের মুখে আসে, যারা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় আরো কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তোলে।
রবিনস বলেন, কলাম্বিয়ায় যদি সত্যিকারের ইহুদিবিদ্বেষের ঢেউ থাকত, তাহলে সেটি অবশ্যই গুরুতর বিষয় হত। কিন্তু তেমন কিছু ঘটেনি। শুধু ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলা হয়েছে।
তবে প্রশাসন এসব কথা শুনছে না। ট্রাম্প প্রশাসন যখন কলাম্বিয়ার ৪০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান আটকে রাখার শর্ত দিল, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল— হয় আদর্শের পক্ষে দাঁড়াবে, নয়তো মাথা নত করবে। শর্তগুলো স্পষ্ট— আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে, ফিলিস্তিনপন্থী বক্তৃতাগুলো দমন করতে হবে, এমনকি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকান স্টাডিজ বিভাগের ওপর সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণ বসাতে হবে।
রবিনস বলেন, এটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লড়াই নয়, এটি এক বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। তিনি বলছেন, এটি ১৯৫০-এর দশকের সেই ম্যাকার্থিবাদকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিজমের ভয়ে বুদ্ধিজীবীদের দমন করা হয়েছিল। আজও একই কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে, শুধু নাম ভিন্ন।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে 'ম্যাকার্থিবাদ' শব্দটি ব্যবহার করতে হবে এবং ১৯৫০-এর দশকের সেই দমন-পীড়নের সঙ্গে তুলনা করতে হবে। আমরা যদি সত্যিই তথ্যপ্রমাণ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার পক্ষে থাকি, তাহলে সরকারকে অবশ্যই আমাদের সামনে প্রমাণ দেখাতে হবে। কিন্তু এখানে কোনো প্রমাণ নেই।
তিনি জানেন, তিনিও হয়তো এই দমনের শিকার হতে চলেছেন। গত বছর তিনি তার ক্লাসের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আন্দোলনের ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। এখন দুই শিক্ষার্থী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। রবিনস তাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তের সম্মুখীন।
একইভাবে, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ক্যাথরিন ফ্রাঙ্কিকে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মকাণ্ডের জন্য বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে, যা অনেকের কাছেই নতুন যুগের ম্যাকার্থিবাদ।
ব্রুস রবিনসের আশঙ্কা,হয়তো এমন কোনো রায় আসবে যার কারণে তিনি চাকরি হারাবেন। হয়তো তার একাডেমিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। তবু তিনি প্রশ্ন তোলেন— আমরা কি প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেব, নাকি নিছক অভিযোগের ভিত্তিতে? যদি প্রমাণ থাকে, তবে দেখানো হোক।










