বিশ্ব রাজনীতিতে কেটেছে আরো এক উত্তাল সপ্তাহ। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা হয়েছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং ইউক্রেনে অব্যাহত রয়েছে রাশিয়ার বোমা হামলা।

সামনের সপ্তাহে সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইউএস-ইউক্রেন বৈঠক। কিন্তু আসন্ন এ বৈঠকের আগে আন্তর্জাতিক বৃহৎ শক্তিগুলো কী ভাবছে— সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন বিবিসির পাঁচজন প্রতিবেদক।

যুক্তরাষ্ট্র: রাশিয়ার বিরল সমালোচনা, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেডি ভ্যান্সের বিতর্কিত মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনের প্রতি সামরিক এবং গোয়েন্দা সহায়তা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় প্রভাব পড়তে পারে। ট্রাম্পের ডেমোক্রেটিক প্রতিপক্ষরা দাবি করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এ পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, ট্রাম্প রাশিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল।

প্রশাসনের মতে, এটি প্রেসিডেন্টের খনিজ সম্পদ সংক্রান্ত চুক্তির জন্য জেলেনস্কির ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল। ট্রাম্পের দূত জেনারেল কিথ কেলোগ এই প্রসঙ্গে বলেন, এটি এক রকম কঠোর পদক্ষেপ, যা ইউক্রেনের ওপর প্রভাব ফেলবে এবং তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত পাঠাবে।

তবে সপ্তাহ শেষে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু সদস্য ইউক্রেনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্থাপনের জন্য সফরের পরিকল্পনা করেছেন। শুক্রবার ট্রাম্প রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞারও হুমকি দিয়েছেন। যদিও এরইমধ্যে রাশিয়া ব্যাপকভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।

রাশিয়া: পশ্চিমা বিভক্তি দেখে সন্তুষ্ট, হামলা জারি

ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার হুমকি আসার আগ পর্যন্ত রাশিয়ার জন্য সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূল মনে হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা স্থগিত হওয়া ইউক্রেনের জন্য বড় ধাক্কা, যা রাশিয়ার পক্ষে সুবিধাজনক।

রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং যুদ্ধের মূল লক্ষ্য পূরণের জন্যও তারা আগ্রহী। দেশটি ইউক্রেনের আরো অঞ্চল দখলের পরিকল্পনা অব্যাহত রেখেছে।

সে সঙ্গে, ইউক্রেনের মিত্রদের পক্ষ থেকে যে কোনো শান্তি প্রচেষ্টা বা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়া। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ এ প্রসঙ্গে বলেন, ট্রাম্পের আমেরিকা আর আমাদের পক্ষে নেই।

এ ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য ইতিবাচক খবর। পশ্চিমা জোটের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার লক্ষ্য ছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তন এবং ইউরোপের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখে রাশিয়া আত্মবিশ্বাসী বোধ করছে। আসন্ন সৌদি আরবের আলোচনায় রাশিয়া নিবিড়ভাবে নজর রাখবে।

ইউক্রেন: কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে নতুন আলোচনার প্রস্তুতি

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির জন্য গেল সপ্তাহটি ছিল বেশ কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা হারানোর পর তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। তবে, ব্রাসেলসে তার সাম্প্রতিক সফরে তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন পেলেও প্রত্যাশিত সামরিক সহায়তা নিশ্চিত করতে পারেননি।

ট্রাম্পের কাছে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করার দাবিও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বরং, তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি চিঠি পাঠিয়ে তাদের হোয়াইট হাউসের বৈঠককে ‘দুঃখজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন।

এদিকে, জেলেনস্কি ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেতাদের কাছে সমুদ্র ও আকাশপথে একটি সীমিত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর সমর্থনও পেয়েছেন তিনি।

এক ঘনিষ্ঠ সূত্রের মতে, জেলেনস্কি এখনো আত্মবিশ্বাসী। তিন বছর আগে তিনি কিয়েভে থেকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যত বেশি চাপ আসে তিনি তত বেশি শক্ত হন।

ইউরোপ: নতুন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার দিকে নজর

ইউরোপের নেতারা ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকট নিয়ে চিন্তিত। এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ছায়ায় থাকা ইউরোপ এখন নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে।

ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ইউক্রেনের মাটিতে সামরিক সহযোগিতা পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে রাশিয়া এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে। ম্যাখোঁ আগামী সপ্তাহে ইউরোপের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করেছেন।

তবে আরো বড় প্রশ্ন হলো, ইউরোপ নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেছেন, আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র পাশে না থাকে।

জার্মানির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যার্তস ইউরোপের প্রতিরক্ষায় ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছেন। ম্যাখোঁও এই ধারণার প্রতি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ফ্রান্সেরই হবে।

এই সবকিছুই ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেছেন, আমাদের নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে আমরা আরো নিরাপদ থাকতাম।

বিশ্ব এখন ইউক্রেন-যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন আলোচনার দিকে নজর রাখছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে আর রাশিয়া পশ্চিমা বিভাজন দেখে আনন্দিত। ইউক্রেন নতুন সমর্থন খুঁজছে আর ইউরোপ নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। সৌদি আরবে আসন্ন বৈঠক বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।