ফিরদৌসী কাদরী বাংলাদেশের বিজ্ঞান গবেষণায় এক অনন্য নাম। ফিরদৌসী কাদরী খুব তরুণ বয়সে সিদ্ধান্ত নেন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি না করে মৌলিক গবেষণায় যাবেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মৌলিক গবেষণায় যান। দেশের বিজ্ঞান, ইমিউনোলজিও, ভ্যাকসিন উন্নতির ক্ষেত্রে তার অবদান বাংলাদেশ ও সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে এবং স্বীকৃতি পেয়েছে।
গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তৈরি করেছেন। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছেন। তার ইমিউনোলজি অধ্যয়ন, ভ্যাকসিন ডেভেলপমেন্ট এবং সেই ভ্যাকসিনকে বাংলাদেশের মানুষের উপকারে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার অবদান রাখা সম্ভব হয়েছে মূলত তরুণ বয়সে মৌলিক গবেষণার সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে। বিজ্ঞান গবেষণায়, রোগ প্রতিরোধ গবেষণায় তার নিবেদনের কারণেই আমরা বিশ্বমানের একজন গবেষক পেয়েছি। সাধারণ মানুষকে তার গবেষণার ফল দিয়ে উপকৃত করা যায় সেটা ছিল তার অন্যতম লক্ষ্য। সে লক্ষ্যে তিনি সফল হয়েছেন। দেশে স্যালাইন ও রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় জানি সেসব সম্ভব হয়েছে তার গবেষণার কারণে।
তিনি শুধু জ্ঞান সৃষ্টি করে থেমে থাকেননি। জ্ঞান সৃষ্টি করে তার পরম্পরা রাখার জন্য প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন। ‘আইদেশি’ তার প্রতিষ্ঠিত একটি অসাধারণ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। ফ্রান্স ও বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে যে পুরস্কার ও অর্থ তিনি পেয়েছেন সেসব তিনি তার গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত করেছেন। এ গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী ও বিজ্ঞানীরা গবেষণাকাজে নিয়োজিত আছেন।
ফিরদৌসী কাদরীর জীবনদর্শন এবং সবকিছু সমন্বয় করার দক্ষতা যদি মানুষের মধ্যে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া যায়, তাহলে সম্ভাবনাময়ী অনেক তরুণ আগ্রহী হবেন। এর ফলে বাংলাদেশ সম্মানিত হবে, আন্তর্জাতিকভাবেও সম্মানিত হবে।
আমার সুযোগ হয়েছে তার বিভিন্ন আলোচনা শোনার। সেখানে তিনি একজন সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের প্রফেশনাল ব্যক্তি। তাকে সেখানে খুব সংক্ষিপ্তভাষী, নির্ভুল, স্পষ্ট ও গম্ভীর মানুষ বলে মনে হয়। আবার তিনি যখন পরিবারে আসেন, আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন তখন তাকে মনে হয় খুব উষ্ণ হৃদয়ের একজন মানুষ, যিনি সবাইকে গ্রহণ করতে পারেন। সম্পর্কের দিক থেকে আমি তার এক ননদের স্বামী। সে হিসেবে তিনি আমার ভাবি। তিনি আমাদের সবাইকে আপন ভাইয়ের মতো স্নেহ করেন।

গবেষণাগারে ড. ফিরদৌসী কাদরী ছবি: বণিক বার্তা
স্বামীর সঙ্গে ওনার সম্পর্কটা ছিল অসাধারণ। ভাবি একদিকে পরিবার, প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক এককথায় সব জায়গায় তিনি সমন্বয় রাখতে পারেন। জীবন, গবেষণা, একই সঙ্গে পরিবারেও তিনি একটা মেলবন্ধন তৈরি করেছেন। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও পরিবারকে হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে আঁকড়ে রেখেছেন।
আর তিনি ব্যক্তি হিসেবে খুব অমায়িক। সালেহীন ভাই আমাদের পরিবারের সবার বড়। ভাবি সে হিসেবে সবার শ্রদ্ধার। পরিবারে যার যেটা প্রাপ্য, যাকে যেটা দেয়া দরকার, যাকে যেভাবে সচেতন, সজীব রাখা যায় তিনি সবটুকু করেন। ভাবির বেশির ভাগ ননদের জন্মদিন সেপ্টেম্বরে। তিনি জন্মদিন মনে রাখেন। সবাইকে জন্মদিনে গিফট পাঠানো, উইশ করা, ঈদের অনুষ্ঠানে একসঙ্গে আনন্দ করা, নিজের বাড়িতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, সবাইকে নিয়ে সবকিছু করা—এটা আসলে অবাক করার মতো।
একজন বিজ্ঞানীর পক্ষে এতকিছু একসঙ্গে সমন্বয় করা সাধারণত কঠিন। কারণ বিজ্ঞানীরা একটা কঠোর শৃঙ্খল পরিবেশে থাকেন। শৃঙ্খলার মধ্যে থাকা, সবাইকে নিয়ে থাকা এবং মন মাতানো একটা অবস্থার মধ্যে থাকার চেষ্টা সবসময় করেন।
তিনি গবেষণার বিষয় যেমন খুঁটিনাটিসহ তার নখদর্পণে, একইভাবে পরিবারের বিষয়গুলোও তার নখদর্পণে।
তিনি সাধারণত মাছ-মাংস, সবজি ও ভর্তা খেতে পছন্দ করেন। সাধারণ বাঙালি পছন্দের মতোই তার পছন্দ। তিনি সবাইকে নিয়েই থাকেন এবং আনন্দ, উল্লাস পছন্দ করেন। মুভি দেখেন, গান শোনেন। অবসর পেলে তিনি মুভি দেখেন। বিভিন্ন সিরিয়াল, নাটক দেখেন। তার পরিবারে গানের একটা পরিবেশ আছে। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গান তার অনেক পছন্দ। তিনি যখন একা থাকেন তখন নীরবে গান গেয়ে যান। রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে যে রকম একটা আত্মনিমগ্নতা রয়েছে তার মধ্যেও এমন একটা ব্যাপার দেখা যায় এবং সেটিকে তিনি উপভোগ করেন।
এ সবকিছুর পাশাপাশি তার জীবনজুড়ে বাংলাদেশ, দেশের সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্ম। তিনি তার তিনটি সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। তাদের তিনি সুন্দরভাবে গাইড করেছেন। তার পরে তিনি চাইলে বিশ্বের যেকোনো দেশে যেতে পারতেন, গবেষণা করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। আমাদের পরিবারে কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চাইলে তিনি উৎসাহিত করেন। কিন্তু তার মধ্যে একটা বেদনার ছাপ দেখা যায়। সবাইকে নিয়ে তিনি দেশে থাকতে চান। দেশের প্রতি তার একটা মমতা আছে, ভালোবাসা আছে। তিনি কিছুদিন আগে নিজের কাজের জন্য স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন। স্বীকৃতিটি একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিককে দেয়া হয়েছে। দেশের জন্য কাজ করা এবং যা শিখেছেন তা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া ড. ফিরদৌসী কাদরীর মৌলিক অঙ্গীকার। দেশ ও তরুণ প্রজন্ম, নিজের অর্জিত জ্ঞান, জ্ঞান সৃষ্টি করা, সে জ্ঞান তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া এবং ছড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আইদেশির মধ্যে প্রতিফলিত। এসবই তার মৌলিক দর্শন।
ড. জালাল আহমেদ: সাবেক পরিচালক, বাংলা একাডেমি










