আমিরুল ইসলাম চৌধুরীকে আমরা ময়না ভাই বলে ডাকি। তার আমিরুল ইসলাম নামটা জানার আগেই ময়না ভাই নামেই তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ময়না ভাই নামে পরিচিত ছিলেন। একবার তার মেয়েকে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, তার বাবার নাম কী। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ময়না ভাই’। সবাই তাকে ময়না ভাই বলেই ডাকে।
সহকর্মী হিসেবে আমার কাছে তার ব্যক্তিত্বের দুটো দিক সবসময় ফুটে উঠেছে। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে এক রকম, কর্মজীবনে আরেক রকম। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন খুবই সাদাসিধে ও মিশুক প্রকৃতির মানুষ। কোরবানির ঈদে আমরা তার বাসায় ডিনারে যেতাম। ঠিক তার পরদিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইনোরিটি কর্মচারী, কর্মকর্তা, শিক্ষকদের দাওয়াত দিতেন। এটা একটা রীতি হয়ে গিয়েছিল। আমরা ব্যাপারটাকে খুবই প্রশংসা করতাম। এই দিক থেকে দেখলে, তিনি ছিলেন খুব সেক্যুলার প্রকৃতির একজন মানুষ।
ময়না ভাই ব্যক্তিগত জীবনে নরম প্রকৃতির, অনেকটা ‘নন-অ্যাসার্টিভ’ ধরনের মানুষ। কিন্তু কর্তব্য কিংবা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কঠিন প্রকৃতির। এক্ষেত্রে কয়েকটা উদাহরণ দিচ্ছি। তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না। কিন্তু একবার বেশ সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। কোনো একটা ছাত্রসংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা হলগুলো দখল করে নিয়েছিল। এটা নিয়ে পুরো ক্যাম্পাসে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল এবং পরে পুলিশ নিয়ে আসা হয়। হলে রেইড দিতে পুলিশ সাহস পাচ্ছিল না। আমিরুল ইসলাম চৌধুরী তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। পুলিশের গড়িমসি দেখে তিনি সবার অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে গেলেন। ফলে হলে ঢুকতে এবং পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বাধ্য হলো।
কোনো ঠুনকো অজুহাত হাজির করে পরীক্ষা পিছিয়ে দেয়ার অভ্যাস ছিল জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের। এসব ব্যাপারে তিনি একটু শক্ত ছিলেন। মূলত পরীক্ষার শিডিউলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় পরীক্ষা কমিটি। এখানে তার ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকে না। তবে একবার তিনি একটি পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান থাকাকালীন এ রকম একটি প্রচেষ্টাকে আটকে দিয়েছিলেন। সেবার শিক্ষার্থীদের অজুহাত ছিল, তাদের একজন সহপাঠী অসুস্থ (অসুস্থ শিক্ষার্থী যদিও আমিরুল ইসলামের নিকটাত্মীয় ছিল)। তিনি কিছুতেই পরীক্ষাটি পেছাতে রাজি হলেন না। বরং তাকে সিক বেডে নিয়ে পরীক্ষা দেয়ালেন।
ছাত্রদের সঙ্গে মেশার ক্ষেত্রে তিনি প্রটোকল মেইনটেইন করতেন না। একটা ঘটনার কথা বলি। তিনি তখন ভাইস চ্যান্সেলর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মাঝেমধ্যে রাস্তা অবরোধ করে ফেলে। এ রকম একটা ঘটনায় তিনি প্রটোকল ভেঙে রাতে তাদের সঙ্গে বসে গল্প করছেন। তবে প্রথমে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যাতে রাতে অন্তত রাস্তা ছেড়ে উঠে আসে।
১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর কমিশনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তাকে। আসলে এসব ব্যাপারে তিনি প্রকাশ্যে কিছু বলতে পছন্দ করতেন না। তবে মাঝেমধ্যে বলতেন কী প্রচণ্ড চাপের মধ্যে তিনি আছেন। বিশেষ করে যাদের ওপর অভিযোগের তীর, তারা অনেকেই তার কাছের মানুষ। কিন্তু আমিরুল ইসলাম চৌধুরী সেসব উপেক্ষা করে অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন। কাজটি করতে গিয়ে তিনি সামাজিকভাবে কতটা চাপে আছেন সেটা মাঝে মাঝে প্রকাশ করতেন।
কাজটা করতে গিয়ে তিনি কিছু শত্রুও তৈরি করেছেন। মূলত তিনি যেটা সঠিক মনে করতেন, সেটাই করতেন। এটা তার একটা গুণ ছিল। শেয়ার কেলেঙ্কারি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি যেটা ন্যায় বা সত্য মনে করছেন, এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে তিনি কখনো পিছপা হতেন না, সেটা নিকটাত্মীয় বা নিকট বন্ধুবান্ধব যার বিরুদ্ধেই যাক না কেন।
আমি সবশেষে একটা কথা বলতে চাই। ময়না ভাইকে ভালোবাসত না এমন মানুষ বোধ হয় জাহাঙ্গীরনগরে ছিল না। আমি নিজেই এ রকম অনেক আলোচনার সাক্ষী যে জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী ময়না ভাইকে কতটা ভালোবাসেন। আমি একটা উদাহরণ দিই, ব্রাজিলে পেলে সবচেয়ে নামকরা ফুটবলার। তাকে নিয়ে ব্রাজিলবাসী অনেক উচ্ছ্বসিত। কিন্তু তাদের যদি জিজ্ঞেস করেন, আপনারা গারিঞ্চাকে কীভাবে দেখেন (যিনি পেলের সমসাময়িক ছিলেন)? তারা একটা কথা বলেন, পেলেকে আমরা শ্রদ্ধা করি, কিন্তু গারিঞ্চাকে আমরা ভালোবাসি। তার হয়তো পেলের মতো বিশ্বজোড়া সুনাম হয়নি। কিন্তু ব্রাজিলবাসীর কাছে তিনি ছিলেন এমনই একজন মাটির মানুষ, তাদের অন্তরের মানুষ। যদি কোন ফুটবলারকে ভালোবাসেন জিজ্ঞাসা করা হয়, উত্তরে সেটা পেলে না হয়ে গারিঞ্চা হয়। তাই আমি একবার বলেছিলাম, গারিঞ্চা হলো একটি পাখির নাম। এজন্য আমার একটি লেখায় বলেছিলাম, সেই অর্থে, ময়না ভাই হলেন একটি পাখি। জাহাঙ্গীরনগরের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্ব। ভালোবাসার ব্যক্তিত্ব এই ময়না পাখি, গারিঞ্চা পাখির মতোই।
উনি সাংস্কৃতিক মননের অধিকারী ছিলেন। একবার তিনি ভালো ভালো আর্টিস্টকে নিয়ে একটি দিনব্যাপী ওয়ার্কশপ আয়োজন করে ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি আঁকিয়েছিলেন। সেগুলো ভিসি অফিসসহ বিভিন্ন জায়গায় টাঙিয়ে রেখেছিলেন। তিনি যখন ভিসি ছিলেন, প্রায়ই বিভিন্ন আর্টিস্টকে দাওয়াত দিতেন। মাঝে মাঝে তিনি ক্যাম্পাসে অথবা বেশির ভাগ সময়ই আমাদের নিয়ে ছোটখাটো গান-বাজনার আয়োজন করতেন। কখনো কখনো বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসতেন। যেমন একবার প্রফেসর আনিসুর রহমানকে এনেছিলেন। তিনি রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন এবং রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একটি বক্তৃতা দিলেন। এ ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তিনি প্রায়ই আয়োজন করতেন।
আমিরুল ইসলাম চৌধুরী জাহাঙ্গীরনগরের সর্বশ্রেষ্ঠ ভিসি ছিলেন কিনা তা নিয়ে তর্ক হতে পারে, কিন্তু তিনি ছিলেন সবচেয়ে প্রিয় ভিসি।
অধ্যাপক ড. তাজুল ইসলাম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর সহকর্মী। বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক










