আমার বাবা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী পেশাগত ব্যস্ততা সত্ত্বেও আমাদের কাছে সবসময় বন্ধুর মতো ছিলেন। বাবা কাজের জন্য প্রচুর ভ্রমণ করতেন। সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফিরলেও আমাদের জন্য ঠিক সময় বের করে নিতেন। তিনি পড়াশোনা নিয়ে বেশি কথা বলতেন না, বরং জিজ্ঞেস করতেন, কেমন দিন গেল, কী করলে সারা দিন, নতুন কিছু শিখলে কিনা?
বাবা নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে আম্মার সঙ্গে আলোচনা করতেন। আমি বড় হওয়ার পর পরীক্ষার খবর জানতে চাইতেন। কিন্তু পড়ার জন্য কখনই চাপ দিতেন না। তার একটিই কথা ছিল, যা-ই করো, সেটা ভালো করে মন দিয়ে করো। মধ্যপন্থা চলবে না।
টিনএজার থাকাকালীন আমার প্রতি তিনি কিছুটা কঠোর ছিলেন। কিন্তু এটি নিয়েও আমাদের মাঝে খুব মজা হতো। বাবা বলতেন, ‘তোমরা নিজেদের মতো করে কিছু করতে চাও, সাহস নিয়ে করো। কিন্তু যে দেশে থাকি, সেখানকার যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, এটারও যেন সম্মান থাকে।’
বাবা ছিলেন তুলা রাশির জাতক। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি আমাদের বলতেন, ব্যালান্স করে চলবে।
আমরা যখন ভাই-বোন কাজে ঢুকলাম, তখনো এ কথাই বলতেন। তিনি বলতেন, ‘কাজও করবে পাশাপাশি পরিবারের জন্যও তোমাদের ব্যালান্স থাকা উচিত। বন্ধুদের সঙ্গেও ঘুরতে যাবে, বই পড়বে, গান শুনবে।’
জীবন সম্পর্কে তার দর্শন ছিল প্রায়োরিটির ভিত্তিতে। ছোটবেলায় প্রায়োরিটি ছিল পড়াশোনা। আমাকে বলতেন, ‘বিয়ের পর তোমার স্বামী এবং পরিবার প্রায়োরিটি। প্রায়োরিটি বদলাতে পারে, কিন্তু সবসময় মনে রেখো প্রায়োরিটিগুলো কী।’
বাবা কখনো কোনো কিছুতে হার মানতেন না। তার সরল দর্শন ছিল—যা হওয়ার হবে, তবে চেষ্টা করব আমরা। তারপর দেখা যাবে।

পরিবারের সঙ্গে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী
বাবার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার দেশপ্রেম। তিনি সবসময় দেশের জন্য চিন্তা করতেন। আমরা ছোটবেলাতেও এগুলো শুনতাম, বড় হয়েও সেটা শুনেছি। যা-ই করো দেশে এসে করো, দেশের জন্য করো সেটা কেউ বুঝুক আর না বুঝুক করতে হবে।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সততা ও পেশাদারত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য একটি রোল মডেল।
তিনি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি হিসেবে ২০০২ সাল থেকে কাজ করেছেন। অবাক করা বিষয়, তিনি তার ব্যস্ততা সত্ত্বেও কখনো মিটিং মিস করেননি। অসুস্থতার সময় সিঙ্গাপুর থেকেও জুমে মিটিংয়ে যোগ দিতেন। তার কাছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছিল সবার ওপরে। বাবা আমাকে বলতেন, ‘গোঁজামিল দিয়ে কখনো কাজ করবে না। সবকিছু স্বচ্ছ রাখবে।’
বাবা ছিলেন ভীষণ পারিবারিক মানুষ। আমার বাবা-মা দুজনে ছিলেন ভালো বন্ধু। তাদের মধ্যে ঐক্য ছিল। পরিবার ও স্ত্রীর প্রতি তার দায়িত্ব ও ভালোবাসা ছিল পরিপূর্ণ।
ভ্রমণে গেলে আব্বা সবচেয়ে বেশি উৎফুল্ল থাকতেন। তিনি সেখানকার ইতিহাস জানতে চাইতেন, ট্যুর গাইডদের সঙ্গে গল্প জমাতেন এবং নতুন নতুন খাবার খেতে পছন্দ করতেন। তার পুরনো সিনেমা দেখা, রবীন্দ্রসংগীত শোনা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন (যেমন টাইম, নিউজউইক, ইকোনমিস্ট) পড়ার অভ্যাস ছিল। আমাদের বাড়িতে এগুলো নিয়মিত আসত।
নাতি-নাতনিদের তিনি প্রচণ্ড ভালোবাসতেন আর তাদের কাজেও সমর্থন দিতেন। তাদের সঙ্গে তিনি মোটেই কঠোর ছিলেন না। আমরা মজা করে জানতে চাইলে তিনি বলতেন, ‘নাতি-নাতনিদের সব রকম অধিকার রয়েছে। শাসন করতে চাইলে তোমরা করো।’
বাবার সেন্স অব হিউমার ছিল সাংঘাতিক ভালো। তিনি নিজেকে কখনো খুব বেশি সিরিয়াসলি নিতেন না এবং আমাদেরও বলতেন, ‘এত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই।’
মুনিজে মঞ্জুর: সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর কন্যা। পরিচালক, এপেক্স ফুটওয়্যার এবং প্রিন্সিপাল, সানবিমস স্কুল










