প্যারিস সেইন্ট-জার্মেই (পিএসজি) যখন ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা ছুঁয়ে দেখল তখন লুইস এনরিকের মন ছুটে গিয়েছিল অন্য কোনো স্থানে, অন্য কোনো ভুবনে—তার প্রয়াত কন্যা জানার কাছে।
ছয় বছর আগে, মাত্র নয় বছর বয়সে বিরল অস্থি ক্যানসার অস্টিওসারকোমাতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় জানা। মিউনিখ ফাইনালে নিজের কোচিং ক্যারিয়ারের শীর্ষে আরোহণের ঠিক সেই মুহূর্তে বাবা এনরিকে তার ভালোবাসার সেই ছোট্ট মেয়ের প্রতি বললেন— ‘ও সবসময় আমার হৃদয়ে আছে।’
খেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পিএসজি সমর্থকরা তুলে ধরেন একটি বিশাল টিফো—যেখানে আঁকা ছিল লুইস এনরিকে ও জানা। পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি, যখন ২০১৫ সালে বার্সেলোনার কোচ হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পর মাঠে বার্সার পতাকা পুঁতেছিলেন এনরিকে, সঙ্গে ছিল ছোট্ট জানা।
এনরিকে সেই টিফো নিয়ে বলেন, ‘ভক্তদের সেই ব্যানার… আমার পরিবারের জন্য ওটা ছিল অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্ত। আমি সবসময় আমার মেয়ের কথা ভাবি।‘

জানার সঙ্গে এনরিকে, ২০১৫ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের পর। ছবি- সংগৃহীত
পিএসজির জন্য এই চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা শুধু একটি ট্রফি নয়—এটি ছিল ১৩ বছরের অপেক্ষা, ব্যর্থতার দগদগে ক্ষত এবং মালিকদের দীর্ঘকালের স্বপ্ন পূরণের মুহূর্ত। লুইস এনরিকের দল শুরু থেকেই ইন্টারের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছে। ম্যাচের একেকটা পর্ব যেন ছিল লুইস এনরিকের কৌশলের নিখুঁত অনুবাদ। মিউনিখ ফাইনালে ৫-০ গোলে জয় এনে দিয়ে পিএসজি রচনা করে ইউরোপীয় ফুটবলের নতুন অধ্যায়।
‘প্রথম দিন থেকেই আমি বলেছিলাম, গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি জিততে চাই। প্যারিস কখনো চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতেনি। এবার সেই স্বপ্ন সত্যি হল,’—গর্বের সঙ্গে বললেন এনরিকে। ‘অসাধারণ অনুভূতি, যখন আপনি জানেন আপনি অসংখ্য মানুষকে আনন্দ দিতে পেরেছেন।‘
১৯ বছর বয়সী পিএসজি উইঙ্গার দেজাইরে দুয়ে ছিল এই রাতের নায়কি। ম্যাচের প্রথম ও তৃতীয় গোল করে নিজের নাম তুলে দেন ইতিহাসের পাতায়। দুয়ের পারফরম্যান্সে খুঁজে পাবেন সাহস, নির্ভরতা আর অদম্য মেধার এক নিটোল প্রকাশ।
‘আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না আজ রাতে যা ঘটেছে,’—বললেন দুয়ে। ‘আমরা ইতিহাস গড়েছি—পিএসজির জন্য, ফরাসি ফুটবলের জন্য, ইউরোপের জন্য। আমরা দুর্দান্ত একটা দল, আর সেটা আজ দেখিয়েছি।‘
৫-০ গোলের পরাজয়ে ইন্টারের গর্বে আঘাত লাগলেও আশাবাদী কোচ সিমোনে ইনজাঘি। এমন এক হারের পরও ভেঙে পড়েননি। তিনি স্বীকার করলেন, ‘এটা বেদনাদায়ক। আমরা স্বাভাবিক খেলা খেলতে পারিনি।‘ সে সঙ্গে যোগ করলেন—‘২০২৩ সালেও আমরা ম্যানচেস্টার সিটির কাছে হেরে গিয়েছিলাম। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে লিগ জিতেছিলাম। এবারও তা পারব।‘
সবশেষে, মিউনিখের রাতটা সবিশেষ হয়ে থাকবে লুইস এনরিকের জন্য। বার্সার পর পিএসজির হয়ে ট্রেবল জয়ের জন্য। তবে সব অর্জন চোখে দেখা যায় না। সে কারণেই, ট্রফি এক দিকে, টিফো আর চোখের জল আরেক দিকে— এনরিকের জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন রাত হয়তো এটাই ছিল।










