ম্যানচেস্টার সিটির ভক্তরা ম্যাচের শুরুতে ইতিহাদ স্টেডিয়ামে নিয়ে এসেছিলেন বিশাল এক পতাকা। রেয়াল মাদ্রিদ এবং ভিনিসিয়াস জুনিয়রের প্রতি ব্যঙ্গাত্মক বার্তা ছিল সেখানে; অবধারিতভাবেই তা ছিল রদ্রির ব্যালন ডি’অর জয়ের প্রতিক্রিয়ায় ব্রাজিলিয়ান তারকাদের ক্ষোভের জবাব। 'স্টপ ক্রাইং ইয়োর হার্ট আউট'— ওয়েসিস ব্যান্ডের গানের লাইনের পাশে ছিল ব্যালন ডি’অর ট্রফিতে চুম্বনরত রদ্রির ছবি। এই পুরস্কারের অনুষ্ঠানে প্রতিবাদস্বরূপ অংশগ্রহণই করেনি রেয়াল মাদ্রিদ।

তবে চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম ও অভিজ্ঞ ক্লাবটিকে কটাক্ষ করা যে ঝুঁকিপূর্ণ সেটাই আবার প্রমাণিত হলো। ইতিহাদে শেষ বাঁশির পর সব মন খারাপের অনুভূতি ছিল সিটি এবং তাদের সমর্থকদের। কারণ, চিরচেনা কৌশলে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল করে ৩-২ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে রেয়াল মাদ্রিদ। শেষ ষোলোয় পৌঁছানোর লড়াইয়ে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে দ্বিতীয় লেগে তারা যাবে প্রয়োজনীয় সবটুকু আত্মবিশ্বাস ও গোলের সুবিধাজনক সমীকরণ নিয়ে।

real 3

গার্দিওলের অ্যাসিস্টে হাল্যান্ডের গোলে লিড নিয়েছিল সিটি। ছবিঃ এপি

নকআউট পর্বের প্লে অফের প্রথম লেগে দুই দফা পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তে ব্রাহিম দিয়াজ ও জুড বেলিংহামের গোলে সিটিকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। ঘরের মাঠে রেয়ালের বিপক্ষে ম্যাচের ১৯ মিনিটে আর্লিং হ্যালান্ডের গোলে প্রথম লিড নেয় ম্যানচেস্টার সিটি। প্রথমার্ধের বিবর্ণ মাদ্রিদ ঘুরে দাড়ায় দ্বিতীয়ার্ধে। ৬০ মিনিটে রেয়ালকে সমতায় ফেরান কিলিয়ান এমবাপ্পে।

তবে পেনাল্টি থেকে ৮০ মিনিটে আবারো সিটিজেনদের এগিয়ে দেন হ্যালান্ড। হারের দুয়ারে দাঁড়িয়ে এরপর দারুণভাবে ঘুরে দাড়ায় লস ব্লাঙ্কোসরা। বদলি হিসেবে নামার পরপরই, ৮৬ মিনিটে ভিনিসিয়াসের অ্যাসিস্টে রিয়ালকে সমতা এনে দেন ব্রাহিম দিয়াজ। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে আবারো সিটি রক্ষণে চিড় ধরান ভিনিসিয়াস। তার থ্রু বলে গোল করে রিয়ালের জয় নিশ্চিত করেন জুড বেলিংহ্যাম। তবে ম্যাচটা ফেভারিট হিসেবে শুরু করে রেয়াল যে জিতেছে তার চেয়েও বেশি আলোচনা হতে পারে যেভাবে জিতলো তা নিয়ে। অবশ্য ফিরে আসার গল্পটা বারবার লিখে রেয়াল নিজেই তা ক্লীশে করে ফেলছে কিনা, সেটাও আরেক আলোচনার দাবি রাখে। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২-১ গোলে এগিয়ে থাকা সিটি সেখান থেকে যোগ করা সময় মিলিয়ে মোট ৬ মিনিটের মাথায় দেখলো রেয়ালের ম্যাচের ভাগ্য বদলানোর খেলা। ভালোবাসার সপ্তাহে লস ব্লাঙ্কোসরা যেন ফুটবলকে আরো বেশি ভালোবাসার বার্তাই দিল।

ইউরোপীয় ফুটবলের আরেক বার্তা এখানে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মাদ্রিদ ডিএনএ’র দৃঢ় আত্মবিশ্বাস, বহু বছরের অভিজ্ঞতা আবারো ইউরোপের সর্বোচ্চ স্তরে আধিপত্য বিস্তার করল পেপ গার্দিওলার কিছুটা বুড়িয়ে যাওয়া ও ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে থাকা ম্যান সিটি স্কোয়াডের ওপর। পার্থক্যটা ছিল স্পষ্ট— দ্বিতীয়ার্ধে সিটি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকে এবং ৮৬তম মিনিটে ব্রাহিম দিয়াজ গোল করার পর যেন পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়ে।

আরো স্পষ্ট ছিল, এই মৌসুমে ম্যান সিটি কখনোই নিরাপদ থাকতে পারছে না, আর রেয়াল মাদ্রিদ এই ম্যাচে কখনোই বিশ্বাস করে না তারা হারবে, হেরে যাওয়ার আগে তো নয়ই। সবশেষ এল ক্ল্যাসিকোসহ চলতি মৌসুমে বিগ ম্যাচগুলোয় ছন্দ হারিয়ে ফেলা রেয়ালের জন্যও এই বিশ্বাস বাড়তি জ্বালানি যোগাবে সামনের পথগুলোয়। আর পেপকে তার স্কোয়াড নিয়ে বাড়তি সময় ব্যয় করতে হতে পারে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে। তার দল এই মৌসুমে পঞ্চমবারের মতো লিড নিয়েও হারলো।

সিটির বর্তমান মানসিক অবস্থা ও ফর্ম বোঝাতে একটা পরিসংখ্যানই যথেষ্ট—শেষ পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ম্যাচের শেষ ১৬ মিনিটে তারা হজম করেছে মোট আটটি গোল, যা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি।

গার্দিওলার দল এখন এমন এক অবস্থায় রয়েছে যেখানে তাদের অনেক খেলোয়াড়ই ক্লান্ত, অনেকেই পুরোপুরি ফিট নন, অথবা রদ্রির মতো কেউ কেউ একেবারেই খেলার মতো অবস্থায় নেই। দলটি যেন ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

real 2

বেলিংহামের জয়সূচক গোলে স্তব্ধ ইতিহাদ। ছবিঃ এপি

গোলবারের নিচে এতদিনের নির্ভরযোগ্য এডারসনকে এখন যেন অনেকটাই অনিশ্চিত লাগছে। সিটির দুই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ৩৩ বছর বয়সী কেভিন ডি ব্রুইনা ও ৩০ বছর বয়সী বার্নার্দো সিলভা ম্যাচে তেমন কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেননি।

জন স্টোনস রক্ষণভাগ সামলানোর চেষ্টা করেছেন। তবে এমবাপ্পে- ভিনিসিয়াস-রদ্রিগোদের মতো খেলোয়াড়দের থামানো সব সময়ই কঠিন। সঙ্গে ছিল জুড বেলিংহামের হুমকি, যার প্রমাণ তিনি শেষ মুহূর্তে দিয়েছেন।

রদ্রি দলের সঙ্গে ছিলেন, তবে মাঠে নয়, গ্যালারিতে। এবং সেই বিশাল পতাকায় তার ছবিও ছিল। তবে মাঠে রদ্রির অনুপস্থিতিতে সিটির খেলার মাঝে ধৈর্য, পাসিং ও রক্ষণাত্মক দৃঢ়তাও অনুপস্থিত ছিল, যা শেষ দিকে তাদের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে অনেক ম্যাচেই।

গার্দিওলার দুশ্চিন্তার তালিকাটা দীর্ঘ হচ্ছে। মাঠে নিজেকে প্রমাণ করতে চাওয়া জ্যাক গ্রিলিশ চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন মাত্র ৩০ মিনিটের মাথায়। সব মিলিয়ে রেয়াল মাদ্রিদ হয়তো বুঝতেই পেরেছিল সিটির থরহরি কম্পমান অবস্থা, আর ইনজুরি টাইমে জুড বেলিংহামের জয়সূচক গোলটা যেন ছিল এক অনিবার্য পরিণতি।

ভিনিসিয়াস জুনিয়র এই গোলের মুহূর্তটা উদযাপন করেছেন সেই ব্যঙ্গাত্মক পতাকার জবাব হিসেবেই। আর এটিই ছিল রেয়াল মাদ্রিদের পরিচিত স্টাইল—শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে শেষ বলে কিছু নেই।

গার্দিওলার সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ—বার্নাব্যুতে জয় ছিনিয়ে আনা। তবে তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে, বর্তমান অবস্থায় থাকা ম্যানচেস্টার সিটিকে নতুনভাবে গড়ে তোলা। তবে, ইউরোপের মডার্ন ক্লাসিকে উত্তরণের ক্ষেত্রে বর্তমান ফর্ম এবং মানসিক ভঙ্গুরতার কারণে সিটির জন্য দ্বিতীয় লেগে বার্নাব্যুতে জয় পাওয়ার জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় অলৌকিক কিছুর। আর অলৌকিক ঘটনা তো সাধারণত রিয়াল মাদ্রিদের পক্ষেই ঘটে!