এফডিসি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি নির্মাতাদের জন্য সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত সুবিধার এক সমন্বিত পরিবেশ প্রদান করে এসেছে। চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিটি স্তরে—গল্প নির্বাচন, দৃশ্য পরিকল্পনা, সেট নির্মাণ, আলোকসজ্জা ও শুটিং—নির্মাতাদের জন্য অপরিহার্য ছিল এফডিসি। বিভিন্ন সময় এখানেই হয়েছে বিখ্যাত সব বাংলা সিনেমার শুটিং। গল্প অনুসারে ইনডোর দৃশ্যের শুটিং হতো এফডিসিতেই। নব্বইয়ের দশক থেকেই এফডিসির বাইরে শুটিং করায় স্বস্তি পেতেন অনেক নির্মাতা।

কিন্তু এফডিসিতে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়া কী ছিল? নির্মাতা শাহীন সুমন, শফিউদ্দিন সাফি ও খিজির হায়াৎ খান জানালেন তাদের সিনেমা নির্মাণ অভিজ্ঞতা। নির্মাতা শাহীন সুমন ও শফিউদ্দিন সাফি এফডিসির ভেতরে ও বাইরে উভয় জায়গায়ই শুটিং করেছেন। তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, কীভাবে তারা এফডিসি ও বাইরের বিভিন্ন লোকেশনে সিনেমা নির্মাণ করতেন এবং শুটিং প্রক্রিয়া পরিচালনা করতেন।

শাহীন সুমন বলেন, ‘গল্প অনুযায়ী এফডিসির বিভিন্ন অংশে শুটিং হতো। গল্পে গ্রামের দৃশ্য থাকত, শহরের দৃশ্য থাকত। শহরের রাস্তাঘাট, অফিস, আদালত, বিল্ডিং, কিংবা গ্রামের গ্রামীণ পরিবেশ—সবই গল্পের অংশ হতো। এফডিসির ভেতরে সিনেমার বাড়ির ভেতরের দৃশ্য, যেমন ড্রয়িং রুম, বেডরুম, মসজিদ, মাদ্রাসা—সবই শুট করা হতো। এছাড়া রাজার দরবারের সিন, গরিব বা বড়লোকের বাড়ি, হাসপাতাল, সিনেমা হল, কোর্ট, বাসস্ট্যান্ড, জেলখানা—সবই এফডিসির বিভিন্ন ফ্লোরে তৈরি করা সেটে শুট করা হতো। ঝরনা স্পটেও শুটিং করা হতো। শহরের রাস্তাঘাটের কিছু সিনও এফডিসির ভেতরে তৈরি করা স্ট্রাকচারে করা হতো।’

এফডিসি থেকে লাইট, ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম পাওয়া যেত। তবে অনেক নির্মাতা বাইরের শুটিং সামগ্রী সাশ্রয়ী মূল্যে নিতেন। এফডিসিতে রাত ১১টার পর শুটিং করলে অতিরিক্ত চার্জ দিতে হতো, যা বাইরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। কখনো কখনো একাধিক সিনেমা একসঙ্গে শুটিং হলে এডিটিং ফ্লোর বা শুটিং ফ্লোর পাওয়া যেত না।

বাইরের লোকেশনে শুটিং করার বিষয়ে শাহীন সুমন বলেন, ‘বাইরে শুটিংয়ের আগে থানায় জানানো হতো। ঝড়-বৃষ্টি হলে শুটিং বন্ধ রাখতে হতো। লাইটিংয়ের জন্য হাই ভোল্টেজ ইলেকট্রিসিটি ব্যবহার করা হতো। প্রয়োজনে জেনারেটরও ব্যবহার করা হতো। ক্যামেরা বা অন্যান্য সামগ্রী এফডিসি থেকে নেয়া হতো। তবে এফডিসির বাইরে থেকেও নিতাম।’

নির্মাতা শফিউদ্দিন সাফি বলেন, ‘এফডিসিতে শুটিং শুরু করার আগে প্রশাসনিক অনুমতি নিতে হতো। ক্যামেরা, সেট নির্মাণ এবং অন্যান্য সামগ্রীর জন্য আগে থেকে আবেদন করতে হতো। এফডিসিতে তখন অনেক সিনেমার শুটিং একসঙ্গে হতো, তাই ক্যামেরা বা অন্যান্য সামগ্রীর বিষয়ে আগে থেকেই অনুমোদন নিয়ে রাখতে হতো।’

চলচ্চিত্র নির্মাতা খিজির হায়াৎ খান এফডিসির ভেতরে সিনেমার শুটিং করেননি। তবে তিনি দেশের বিভিন্ন লোকেশনে সিনেমার শুটিং করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাইরে লোকেশন নির্বাচন করা সহজ ছিল না। বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে প্রতিটি শুটিং স্পটে ভিড় মোকাবেলা করতে হতো। তাই নিরাপত্তা ও লজিস্টিক্যাল সুবিধা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।