মালয়ালম চলচ্চিত্রের ইতিহাসে খুবই বিখ্যাত সিনেমা ‘কিরিদাম’। এটি ভারতের অন্যতম ধ্রুপদী চলচ্চিত্র। মুক্তি পায় ১৯৮৯ সালে। ভারতে বিভিন্ন সময় অনেকে ক্ল্যাসিক ও ট্র্যাজেডি ছবি নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে দর্শকদের বৃহৎ অংশের কাছে ‘কিরিদাম’ সর্বকালের সেরা বলে বিবেচিত।

সিনেমাটির পরিচালক সিবি মালয়াইল। চিত্রনাট্যকার একে লোহিতদাস। এ দুজনের যুগলবন্দিতে নির্মিত সিনেমাটি আজও দর্শকের মনে একই রকম দাগ কাটে। কিন্তু অনেকেই জানেন না—এ কালজয়ী সিনেমার চিত্রনাট্য রচিত হয়েছিল মাত্র তিনদিনে, টানা এক বসায়।

অমৃতা টিভির সংগীতা সমাগম অনুষ্ঠানে কিংবদন্তি লেখক লোহিতদাস জানান, চিত্রনাট্য লেখার সময় আবেগ এত তীব্র ছিল যে গল্প যেন নিজে নিজে কলমে নেমে এসেছিল। এটি তার জীবনে লেখা সবচেয়ে দ্রুততম চিত্রনাট্য। তিনি বলেন, ‘পুরো স্ক্রিপ্টটি আমি শেষ করেছি প্রায় তিনদিনে। এক বসাতেই লিখেছি। গোসল বা অন্য কোনো বিরতি নিইনি। দিন-রাত লিখেছি। শুধু কলমটা কাগজে ছুঁইয়ে দিলেই মনে হতো সেটা নিজে নিজেই লিখে চলেছে। এভাবেই স্ক্রিপ্টটা সম্পূর্ণ হয়।’

কাজটা দ্রুত শেষ করে পরিচালক সিবি মালয়াইলের বিয়েতে সময়মতো পৌঁছতে হবে। লোহিতদাসের এই ছিল তাড়া। তিনি বলেন, ‘‌তবে লিখতে বসলে আমি কখনই জানি না চরিত্রগুলো কোন দিকে যাবে, তাদের যাত্রা কীভাবে এগোবে বা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে। সিবি মালয়াইল আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করত, “ক্লাইম্যাক্সটা কী হবে?” আমি বলতাম, “জানি না। ক্লাইম্যাক্স যেমন হওয়ার, ঠিক তেমনই হবে।” আমরা কখনই আগে থেকে শেষটা ঠিক করে রাখি না। আমি শুধু চরিত্রগুলোর পথ অনুসরণ করি।’

অমৃতা টিভির আয়োজনে ওই আলাপনে পরিচালক সিবি মালয়াইলও উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, কিরিদাম নামটি আসলে লোহিতদাসের লেখা অন্য একটি স্ক্রিপ্টের জন্য ঠিক করেছিলেন। কিন্তু সেই ছবির পরিচালক ও প্রযোজক নামটি খুব একটা পছন্দ করেননি। তখন মোহনলাল অভিনীত তাদের সিনেমায় নামটির ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। কারণ তিনি মনে করেছিলেন—এ গল্পের সঙ্গে কিরিদাম নামটিই সবচেয়ে বেশি মানানসই।

কিরিদামের গল্প আবর্তিত হয়েছে সেতুমাধবন (মোহনলাল) নামে যুবককে ঘিরে। তার পুলিশ অফিসার হওয়ার স্বপ্ন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এক দুর্বৃত্তের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায়। বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে অপরাধী কিরিকাদান জোসকে মারধর করার পর সেতুমাধবন ‘স্থানীয় ডন’-এর উপাধি পেয়ে যান। বদলে যায় তার পরিচয়। হারিয়ে যায় ভবিষ্যৎ। তার জীবন এগিয়ে যায় এক অচেনা অন্ধকার পথে। সেতুমাধবন ও তার বাবার চরিত্রে মোহনলাল-থিলকান জুটির অভিনয় আজও মালয়ালম চলচ্চিত্রের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ সংযোজন বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে থিলকানের সংলাপ—‘নিন্টে আচানাডা পরযুন্নে, কাথি তায্‌হে ইডেডা (তোমার বাবা তোমাকে বলছে, ছুরি ফেলে দাও, থামো।’ এখনো দর্শকের মনে গেঁথে আছে।

মনোরমা অনলাইনের তথ্যানুযায়ী, মাত্র ২৫ দিনে শেষ হয় সিনেমার শুটিং। নির্মাণ ব্যয় ছিল ২৩ দশমিক ৫ লাখ রুপি। তখন মোহনলালের পারিশ্রমিক ছিল সাড়ে ৪ লাখ রুপি। কিন্তু প্রযোজক ও বন্ধু এন কৃষ্ণকুমারের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কের কারণে তিনি ৪ লাখ রুপিতে কাজ করেন। কম বাজেট ও স্বল্প সময়ে তৈরি হলেও সিনেমাটি মুক্তির পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বাণিজ্যিকভাবে সুপারহিট হয়।

সিনেমাটি পরে বহু ভাষায় রিমেক করা হয়। এর মধ্যে তামিলও রয়েছে, সেখানে মোহনলালের চরিত্রে অভিনয় করেন অজিত কুমার।

সিনেমাটি মুক্তির তিন যুগ পার হয়েছে। কিন্তু দর্শকদের মনে কিরিদামের আবেগ, বেদনা ও অভিনয়ের শক্তি আজও অমলিন। এটি মালয়ালম সিনেমার ট্র্যাজেডি ধারার অপ্রতিদ্বন্দ্বী মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

সূত্র: দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস