বিনোদনমাধ্যমে অপরাধ জগতের এ আকর্ষণীয় উপস্থাপন ও গ্ল্যামারাইজেশন কি কেবলই গল্পের দাবি, নাকি বাণিজ্যিক কৌশল? বিশেষ করে উৎসব বা ঈদকে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমাগুলোয় এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এ বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র বিশ্লেষক বিধান রিবেরু ও চলচ্চিত্র নির্মাতা দীপঙ্কর দীপন
গল্পের আড়ালে বাণিজ্যিক ফর্মুলা
সিনেমায় অতিরিক্ত সহিংসতা ও মাদক দেখানোর প্রবণতাকে একটি ‘ফ্যাশনেবল স্টেটমেন্ট’ বা সাময়িক ট্রেন্ড বলে মনে করেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষক বিধান রিবেরু। তিনি বলেন, ‘সিনেমায় অতিরিক্ত সহিংসতা বা মাদক মূলত বাণিজ্যিক কাটতি বাড়ানোর একটি কৌশল। এর মূল কারণ হলো, আমাদের এখানে নকল করার প্রবণতা বেশি। বর্তমান সময়ের দক্ষিণ ভারতীয় (সাউথ ইন্ডিয়ান) কিংবা বলিউডের সিনেমাগুলোয় দেখা যায়, নায়কের হিরোইজম বা বীরত্বকে অতিরিক্ত গ্লোরিফাই করার জন্য মাদক ও সহিংসতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরাও এখন সে একই ফর্মুলা অনুসরণ করছি। এগুলো মূলত ফর্মুলা বা বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমা, সে কারণেই পর্দায় এত বেশি মাদক ও সহিংসতার উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।’
একই প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা দীপঙ্কর দীপন বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে গল্পের প্রয়োজন হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে গল্পের ধরনটাই এমনভাবে নির্বাচন করা হচ্ছে, যেখানে সহিংসতা, রক্তপাত, অপরাধ ও মাদকের ব্যবহার সহজেই বেশি পরিমাণে দেখানো যায়। অর্থাৎ সরাসরি বলা যায়, গল্পের প্রয়োজন আছে, কিন্তু সে গল্প বেছে নেয়ার পেছনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যও কাজ করছে।’
দীপন আরো যোগ করেন, ‘এ প্রবণতার পেছনে সাউথ ইন্ডিয়ান সিনেমার প্রভাবও রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেখানকার অনেক সিনেমায় অতিরিক্ত অ্যাকশন, ভায়োলেন্স, রক্তপাত ও শক্তিশালী ভিজুয়াল উপস্থাপনা দর্শকের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সে জনপ্রিয়তার ধারাই এখন বাংলা সিনেমার কিছু নির্মাতাকে প্রভাবিত করছে। একইভাবে চরিত্র বা পরিস্থিতিকে দ্রুত ডার্ক বা রাফ করে তোলার সহজ কৌশল হিসেবে অনেক সময় মাদকের ব্যবহার দেখানো হচ্ছে।’
সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের ওপর প্রভাব
পর্দায় প্রদর্শিত এ অপরাধ ও সহিংসতার চিত্র তরুণদের ওপর কতটুকু দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভিন্নতা দেখা গেছে।
নির্মাতা দীপঙ্কর দীপন মনে করেন, ‘অপরাধ বা মাদককে আকর্ষণীয় করে দেখানো সমাজের জন্য অবশ্যই ক্ষতিকর। তিনি বলেন, ‘যদি কোনো চরিত্র বা ঘটনার বাস্তবতা বোঝানোর জন্য এসব দেখানো হয়, তাহলে সেটা এক ধরনের বিষয়। কিন্তু মাদক বা অপরাধকে যদি স্টাইলিশ, সাহসী বা আকর্ষণীয়ভাবে দেখানো হয়, তাহলে দর্শকের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে। বাস্তব জীবনে অপরাধ ও মাদকের কোনো ভালো ফল নেই, এগুলোর শেষ পরিণতি সবসময় খারাপ। তাই সিনেমায়ও যদি এর ক্ষতি বা খারাপ পরিণতি না দেখিয়ে শুধু রোমাঞ্চকরভাবে তুলে ধরা হয়, তাহলে তরুণদের মধ্যে এসব বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হতে পারে। সব দর্শক সমানভাবে পরিণত নয়। অনেক তরুণ পর্দায় যা দেখে, তা থেকে প্রভাবিত হয়। কেউ কেউ পছন্দের চরিত্রের আচরণ অনুকরণ করার চেষ্টা করে। তাই নির্মাতাদের এ বিষয়ে আরো দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।’
সমাজ ও সিনেমার এ সমীকরণ কিছুটা উল্টোভাবে দেখছেন চলচ্চিত্র গবেষক বিধান রিবেরু। তার মতে, ‘বাস্তব সমাজে সিনেমার সরাসরি প্রভাব আসলে তুলনামূলকভাবে বেশ কম। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো বড় জেলায় এখন কোনো সিনেমা হলই নেই। কিংবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কতজন মানুষই বা সিনেমা দেখার সুযোগ পান? বাংলাদেশে এখন সিনেমা হলের সংখ্যা একশরও নিচে। এমনকি টেলিভিশনেও মানুষ এখন আগের মতো সিনেমা দেখে না। যতটুকুও দেখে, তা সেন্সর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যায়, কারণ টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ ও সেন্সর বোর্ড উভয়ই এটি নিয়ন্ত্রণ করে। কাজেই চলচ্চিত্র দেখেই মানুষের মধ্যে সহিংসতা বাড়ছে বা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, বিষয়টি তা নয়। সমাজে যে সহিংসতা, অত্যাচার ও নিয়মকানুন ভাঙার প্রবণতা রয়েছে, সিনেমায় মূলত সেটিরই প্রতিফলন ঘটে।’
চলচ্চিত্রকারদের দায়িত্বশীলতার ওপর জোর দিয়ে বিধান রিবেরু বলেন, ‘সিনেমায় এমন কোনো বীভৎস দৃশ্য দেখানো উচিত নয়, যা স্রেফ বাণিজ্যিক উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়। সমাজের অন্ধকার বা দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরার নামে যদি সেটিকে বাণিজ্যিকীকরণ বা ব্যবসার হাতিয়ার বানানো হয়, তবে তা অবশ্যই বিপজ্জনক।’
আইনের প্রয়োগ ও সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র
দেশে সুনির্দিষ্ট আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিতর্কিত কনটেন্ট কীভাবে ছাড়পত্র পেয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
এ ছাড়পত্রের পেছনে ‘দর্শকের চাহিদা’ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপকে দায়ী করেছেন দীপঙ্কর দীপন। তিনি বলেন, ‘এখন অনেক দর্শক সিনেমায় বেশি মারামারি, রক্তপাত বা বিতর্কিত দৃশ্য দেখতে পছন্দ করেন। তাই এসব দৃশ্য কেটে দিলে অনেক সময় তারা বিরক্ত হন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করেন। আগেও দেখা গেছে, কিছু সিনেমার সহিংস দৃশ্য বাদ দেয়া নিয়ে দর্শকের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তখন সেন্সর বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেক সময় চাপের মুখে পড়ে। তারা সরাসরি দর্শকের একটি বড় অংশের বিরোধিতায় যেতে চায় না।’
অন্যদিকে বিধান রিবেরু মনে করেন, সেন্সর বোর্ড মূলত রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন ও কাঠামো মেনেই সিনেমাগুলোর ছাড়পত্র দিয়ে থাকে। তবে আলটিমেট চূড়ান্ত সেন্সরের ক্ষমতা দর্শকের হাতেই থাকা উচিত। তিনি বর্তমান বাজারের একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরে বলেন, ‘এবার ঈদে মারদাঙ্গা ও অতিরিক্ত সহিংসতাপূর্ণ সিনেমাগুলো দর্শক সেভাবে গ্রহণ করেনি। বরং যেসব সিনেমায় সহিংসতা কম এবং গল্প একটু ভিন্ন ধাঁচের, সেগুলোই এগিয়ে রয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। মানুষ আসলে পর্দায় অনবরত এত সহিংসতা দেখতে চায় না। বাণিজ্যিক খাতিরে একই উপাদান বারবার দেখাতে থাকলে দর্শক একসময় মুখ ফিরিয়ে নেয়, এখন সেটাই হচ্ছে। একটা সময় আমাদের দেশে রোমান্টিক সিনেমার ভীষণ জোয়ার ছিল, যা এখন প্রায় হারিয়ে গেছে এবং তার জায়গা করে নিয়েছে সহিংসতা। বর্তমান সমাজে মানুষের ভেতর যে একধরনের ব্যাকুলতা, অস্থিরতা ও যন্ত্রণা রয়েছে, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এ সহিংসতার মাধ্যমে। তবে আমার বিশ্বাস, শুধু এ বাণিজ্যিক উপাদান দিয়ে বেশি দূর যাওয়া যাবে না। মানুষ নিজেই এটি প্রত্যাখ্যান করবে।’
সংগীতকার প্রিন্স মাহমুদের ক্ষোভ
চলচ্চিত্রে এ অতিরিক্ত সহিংসতা ও মাদক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সংগীতকার প্রিন্স মাহমুদ। তিনি এ ধরনের ক্ষতিকর দৃশ্য সংবলিত ছবি বা কনটেন্টের প্রচার অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। ফেসবুক বার্তায় প্রিন্স মাহমুদ লেখেন ‘দেশের চলচ্চিত্র এবং নাটকে মাদক, অতিরিক্ত সহিংসতা ও নারীদের অবমাননামূলক প্রবণতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে এ ধরনের আপত্তিকর কনটেন্ট প্রচার যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ করা হোক। শিশু রামিসার বিচারের দাবি করবেন আবার বিনোদন মাধ্যমে ক্ষতিকর উপাদানগুলো দিয়ে সমাজে বিকৃত মানসিকতা তৈরি করবেন, অপরাধকে গ্ল্যামারাইজ করবেন, এ কেমন দ্বিচারিতা?’
চলচ্চিত্র ও নাট্যসংশ্লিষ্টদের একাংশ দাবি করেন যে এসব নেতিবাচক উপাদান কেবলই ‘গল্পের প্রয়োজনে’ কিংবা ‘দর্শকের চাহিদার’ কারণে দেখানো হয়।









