কণ্ঠগুলো শুধু গান গায় না, মানুষের স্মৃতি, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা কিংবা প্রার্থনার ভাষাও হয়ে ওঠে। এস জানকী ছিলেন তেমনই এক কণ্ঠ। দক্ষিণ ভারত তাকে ডাকত ‘দক্ষিণের কোকিল’ নামে। তার কণ্ঠ ভাষার সীমানা মানেনি। তেলেগু, তামিল, মালয়ালম, কন্নড় থেকে শুরু করে বাংলা, ওড়িয়া, হিন্দি—ভারতের বহু ভাষায় ছড়িয়ে পড়েছিল তার সুর।
১১ জুলাই মহীশূরের একটি হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত জটিলতায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। সিস্তলা জানকীর মৃত্যুতে শেষ হলো ভারতীয় প্লেব্যাক সংগীতের এক গৌরবময় অধ্যায়।
অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুর জেলার পল্লাপাটলা গ্রামে ১৯৩৮ সালের ২৩ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন সিস্তলা শ্রীরামমূর্তি জানকী। ছোটবেলায় পরিবারের রেডিওতে লতা মঙ্গেশকরের গান শুনে তিনি সংগীতের প্রেমে পড়েন। পরে বহুবার তিনি বলেছেন, ‘লতা মঙ্গেশকরই ছিলেন আমার প্রথম গুরু।’ তবে সে অনুপ্রেরণাকে অনুসরণ করেও জানকী কখনো অনুকরণে সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং গড়ে তুলেছিলেন একান্ত নিজস্ব গায়কী। সেখানে আবেগ, উচ্চারণ, কণ্ঠের রঙ ও চরিত্র অনুযায়ী কণ্ঠ বদলে নেয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
শৈশবের বড় একটি সময় কেটেছে সিরিসিল্লায়। নাট্যব্যক্তিত্ব কাকার উৎসাহে মঞ্চে গান গাইতেন তিনি। এমনই এক অনুষ্ঠানে তার কণ্ঠে মুগ্ধ হন চলচ্চিত্র নির্মাতা বিআর পন্থুলু ও সংগীত পরিচালক টিজি লিঙ্গাপ্পা। তাদের আহ্বানেই চেন্নাইয়ে পাড়ি জমান জানকী। ১৯৫৭ সালে ‘ভিধিয়িন ভিলায়াট্টু’ সিনেমায় প্রথম প্লেব্যাক করেন। ক্যারিয়ারের প্রথম বছরেই তিনি ছয়টি ভাষায় গান রেকর্ড করেছিলেন।
এরপর শুরু হয় এক বিস্ময়কর সংগীতযাত্রা। ছয় দশকের বেশি সময়ে তিনি ৪৮ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেন। ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে এ এক বিরল কীর্তি। তামিল, তেলেগু, মালয়ালম, কন্নড়, হিন্দি, বাংলা, ওড়িয়া, সংস্কৃত, তুলু, উর্দুসহ ২০টিরও বেশি ভাষায় তার কণ্ঠ ধ্বনিত হয়েছে। ভাষা বদলালেও বদলায়নি তার গায়কীর প্রাণশক্তি।
জানকী তার কণ্ঠ দিয়ে অভিনয় করতে পারতেন। শিশুর চরিত্রে শিশুর মতো, বৃদ্ধার চরিত্রে বৃদ্ধার মতো কিংবা গভীর প্রেম, শোক, ভক্তি ও উচ্ছ্বাস তিনি নিজ কণ্ঠে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। এ কারণেই তাকে অনেকেই বলতেন ‘কুইন অব এক্সপ্রেশন’।
তার কর্মজীবনে ভারতীয় চলচ্চিত্রসংগীতের একাধিক যুগের প্রতিনিধিত্বকারী সুরকারদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। এমএস বিশ্বনাথন, জিকে ভেঙ্কটেশ, ইলাইয়ারাজা, রাজন–নাগেন্দ্র, এমএম কীরাবাণী থেকে এআর রহমান—প্রায় প্রত্যেকেই তার কণ্ঠকে নিজেদের সৃষ্টির অন্যতম শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে ইলাইয়ারাজার প্রথম চলচ্চিত্র ‘আনাক্কিলি’র (১৯৭৬) গান তাকে দক্ষিণ ভারতীয় প্লেব্যাক সংগীতের শীর্ষস্থানে পৌঁছে দেয়, যেখানে তিনি দীর্ঘ দুই দশক আধিপত্য বজায় রাখেন।
হিন্দি চলচ্চিত্রেও তিনি স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘দিল মে হো তুম’, ‘ইয়ার বিনা চ্যায়েন কাহা’র মতো জনপ্রিয় গান আছে তার ঝুলিতে।
জানকীর শিল্পীজীবনের স্বীকৃতিও ঈর্ষণীয়। চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ নারী প্লেব্যাক গায়িকার সম্মান অর্জন করেন। বিভিন্ন রাজ্য সরকার তাকে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত করেছে। কিন্তু ২০১৩ সালে তিনি পদ্মভূষণ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। তার যুক্তি ছিল, প্রায় ৫৫ বছরের সংগীত সাধনার পর এ স্বীকৃতি অনেক দেরিতে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি আক্ষেপ করেছিলেন, দক্ষিণ ভারতের শিল্পীরা জাতীয় পর্যায়ে প্রাপ্য মর্যাদা সবসময় পান না। এস জানকীর বিশ্বাস ছিল, তার অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি হওয়া উচিত ছিল ভারতরত্ন।
১৯৫৯ সালে ভি রামপ্রসাদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। স্বামী ছিলেন তার শিল্পীজীবনের অন্যতম সহযাত্রী। ২০১৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্লেব্যাক ও মঞ্চগান থেকে অবসর নেন। যদিও পরে বিশেষ অনুরোধে এক-দুটি গান রেকর্ড করেছিলেন।










