অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বিশাল বাজেট পেশ করেন। এবারের বাজেটে সাংস্কৃতি খাতের বরাদ্দ নিয়ে সংস্কৃতিসংশ্লিষ্টদের মনে গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, এ বরাদ্দ সংস্কৃতির মূল ধারার বিকাশে তেমন কোনো ভূমিকা রাখবে না, বরং বরাদ্দের বড় অংশই আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক খরচে শেষ হয়ে যাবে। দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন না ঘটায় এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই এমন বাজেট দেয়ায় তারা ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
এ বাজেট ও সাংস্কৃতি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানিয়ে অভিনেতা ও নাট্যনির্দেশক মামুনুর রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের শাসকদের সংস্কৃতিবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত বাজেটের এই একই ধারা চলতেই থাকবে। আর বাজেট প্রণয়নের ব্যাপারেও সুনির্দিষ্টভাবে আমাদের মতো মাঠপর্যায়ের সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে কখনই কোনো আলোচনা করা হয় না।’ পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথম থেকেই এটি এভাবেই চলে আসছে, তাই ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। গত বছরের তুলনায় এবার মাত্র ২ কোটি টাকা বেশি দেয়া হয়েছে, যা বর্তমান মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় প্রায় সমান বা কাছাকাছি। অথচ বাজেট আরো কত বেশি হওয়া উচিত ছিল! দেশে যদি সংস্কৃতিচর্চাই না বাড়ে, তাহলে তো সমাজ ও মানুষের মধ্যে অস্থিরতা থাকবেই।’
মামুনুর রশীদ আরো বলেন, ‘আমরা যারা বাস্তবে মাঠপর্যায়ে সংস্কৃতির কাজ করি, তারা তো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পৃষ্ঠপোষকতাই পাই না। বাজেটের এ সামান্য টাকা দিয়ে আসলে দেশের মূল ধারার সংস্কৃতিচর্চার কিছুই হয় না। তবে এ টাকা দিয়ে রাজনৈতিক কাজ ঠিকই হয়। অতীতে এমন অনেক সংগঠনকে সরকারি অনুদান বা টাকা দেয়া হয়েছে, যাদের বাস্তবে কোনো ঠিকানাও নেই, আবার সংস্কৃতিতে কোনো ভূমিকাই নেই। তাই সরকারের কাছে এখন আর আমার নতুন কোনো দাবি নেই। কারণ আমাদের এসব দাবি বা কথা সরকারের কান পর্যন্ত পৌঁছে না। আমরা পত্রিকায় কত লেখালেখি করি—কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না।’
সাংস্কৃতি খাতের বরাদ্দের দিকে তাকালে দেখা যায়, নতুন অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৮২৬ কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে এ বরাদ্দ ছিল ৮২৪ কোটি টাকা, অর্থাৎ এবার বেড়েছে আরো ২ কোটি টাকা। নতুন বাজেটের ৮২৬ কোটি টাকার মধ্যে ৪৮৫ কোটি টাকাই চলে যাবে পরিচালন বা প্রশাসনিক খরচে, আর উন্নয়নকাজের জন্য রাখা হয়েছে ৩৪১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, এবারের জাতীয় বাজেটে সাংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ ১ শতাংশেরও কম, অর্থাৎ মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অথচ দেশের মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ, সামাজিক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে সংস্কৃতিকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে অন্তত ২ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
এ বাজেটের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে চলচ্চিত্র সমালোচক ও গবেষক বিধান রিবেরু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশের সরকার বরাবরই সাংস্কৃতি খাতে এক ধরনের অবহেলা করে আসছে, এবারো তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। যেকোনো দেশের মানুষের মানসিক উন্নয়ন ও মনন বিকাশের ক্ষেত্রে এবং শিশুদের সুস্থ পরিবেশের পাশাপাশি সুস্থ দেহের সঙ্গে সুস্থ মন উপহার দিতে সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিল্পের বিকল্প নেই। এসব জায়গায় আমরা যদি বিনিয়োগ না করি, মনোযোগ না দিই, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা কূপমণ্ডূক ও এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল মনমানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে, যার নেতিবাচক প্রভাব আমরা এরই মধ্যে সমাজে দেখতে পাচ্ছি।’
প্রতিবেশী দেশগুলোর উদাহরণ টেনে বিধান রিবেরু বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এ খাতে প্রায় আড়াই শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে, আর আমেরিকায় ৪ শতাংশের বেশি। আমার মনে হয়, আমাদের দেশেও যদি এ বরাদ্দ অন্তত ২ শতাংশের কাছাকাছি আনা যেত, তবে প্রশাসনিক খরচ বাদ দিয়েও অন্তত দেড় শতাংশ সরাসরি কাজে লাগানো যেত। বাকি বরাদ্দ দিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো, শিশুদের খেলাধুলার ব্যবস্থা, পাঠাগার তৈরি এবং নাটক ও গানের চর্চা বাড়ানো সম্ভব হতো। এর ফলে শিশুদের মন যেভাবে বিকশিত হতো, তার সুফল আমাদের দেশ আগামী প্রজন্মে গিয়ে ভোগ করত। আমাদের সমাজের মধ্যে এখন যে এক ধরনের কূপমণ্ডূকতা, প্রগতির বিপক্ষে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং পশ্চাৎপদতা দেখা যাচ্ছে, তা দূর করতে হলে শিল্প-সংস্কৃতিতে বরাদ্দ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতি—এ তিন বিষয়কে যদি জোর দেয়া যায়, তাহলেই একমাত্র জাতি গঠনে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। অন্যথায় আমরা যদি এ খাতে অর্থ বরাদ্দে কৃপণতা করি, তবে এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতি আমাদের দেশকেই পোহাতে হবে।’
অবশ্য এবারের বাজেটে ‘ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি’ বা সৃজনশীল শিল্প খাতকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করার একটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ খাতের উন্নয়ন গতিশীল করতে সরাসরি বাজেট থেকে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে আরো ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে সৃজনশীল অর্থনীতির পরিধি বাড়াতে মোট ৮০০ কোটি টাকার একটি সম্ভাব্য তহবিল গঠনের পথ তৈরি হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ সমন্বয়ে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে বলে বাজেট বক্তব্যে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারের এমন নানা পরিকল্পনার কথা বলা হলেও সামগ্রিক বাজেটটিকে চরম হতাশাজনক উল্লেখ করে অভিনেতা ও নির্দেশক আজাদ আবুল কালাম বলেন, ‘বাজেট আসলে দিতে হয়, তাই দেয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে গতবারের বাজেটের তুলনায় মাত্র ২ কোটি টাকা বাড়ানো তো আসলে সমুদ্রে এক ফোঁটা জলের মতো! আমাদের যা দরকার ছিল, এ বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটেনি। শিল্প, সাহিত্য কিংবা সংস্কৃতি নিয়ে ভাবনাটাই সরকারের মধ্যে নেই। আগের অবস্থান দেখেই আমরা বুঝেছি যে রাষ্ট্র হয়তো মনেই করে না এ খাতের বিকাশ বা উত্থানের কোনো প্রয়োজন আছে।’
বাজেটে ঘোষিত বিশেষ তহবিলের ধোঁয়াশা নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার একটি “সিএসআর” ফান্ডের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেটির সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের যোগাযোগ কীভাবে হবে, কিংবা এ টাকা বরাদ্দ ও ব্যবহারের প্রক্রিয়া কী হবে তা আমাদের জানা নেই। অর্থনীতিতে শুধু একটি ইঙ্গিত দেয়া আছে, ঢাকা এবং পরবর্তী সময়ে উপজেলা পর্যায়ে ‘কালচারাল হাব’ করা হবে। ভবিষ্যতে যদি সত্যিই কাজটা করা যায়, তবে এটি একটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে। তাছাড়া যে টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তার বড় অংশই প্রশাসনিক কাজেই চলে যাবে। ফলে নতুন করে সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ আর থাকল না। শেষ মুহূর্তে আমাদের দীর্ঘদিনের একটি দাবিই পুনর্ব্যক্ত করতে চাই—জাতীয় বাজেটের অন্তত ১ শতাংশ সাংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ রাখা হোক। যদিও সেটা কখনই করা হয়নি, তবুও আমাদের দাবি এটাই থাকবে।’









