সেদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা তিন অধিবেশনে প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলোয় প্রতিফলিত হয়েছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলার বাস্তবতা। ঈদের আনন্দের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা ও মনোবল জাগিয়ে তোলার আহ্বান।

সকাল ৭টায় কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে দিনের অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর বাংলা ও ইংরেজিতে খবর প্রচার হয়। মুক্তিযুদ্ধের এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ের অনুষ্ঠানসূচি ও বিবরণ পাওয়া যায় হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র গ্রন্থের পঞ্চম খণ্ড এবং মুক্তিযোদ্ধা ও বেতারের শব্দসৈনিকদের স্মৃতিচারণায়।

ঈদের দিন সবচেয়ে আলোড়ন তুলেছিল ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও’ শিরোনামের গানটি। সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে প্রচারিত এ গান লিখেছিলেন শহীদুল ইসলাম, সুর করেছিলেন অজিত রায়। শিল্পী রূপা ফরহাদসহ কয়েকজন শিল্পী কোরাসে গানটি পরিবেশন করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলার রক্তাক্ত বাস্তবতাকে সামনে রেখে গানের পঙক্তিতে বলা হয়েছিল—

‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও...

দেখো মানুষের খুনে খুনে রক্তিম বাংলা,

রূপসী আঁচল কোথায় রাখব বলো?’

গানটি ঈদের চাঁদকে ফিরে যেতে বলার এক ব্যতিক্রমী আবেদন হয়ে ওঠে। শব্দসৈনিক কামাল লোহানীর স্মৃতিচারণায় জানা যায়, ঈদের দুদিন আগে গানটি রেকর্ড করা হয়। একাত্তরের সেই সময়ের মানুষের অনুভূতি এত গভীরভাবে এতে প্রতিফলন হয়েছিল যে অনেকেই গানটি শুনে অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদ তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সারা দিন বেজেছিল এ আবেগময় গানটি। শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি; কেঁদেছি, শুধু কেঁদেছি।’ (সূত্র: লেখকের ‘একাত্তরের ঈদ’ শীর্ষক গ্রন্থ)

স্মৃতি আলেখ্যে যুদ্ধের বেদনা

ঈদের দিন প্রচারিত আরেকটি উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান ছিল ‘রমজানের ওই রোজার শেষে’ শিরোনামের স্মৃতি আলেখ্য। এটি রচনা করেন সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। প্রযোজনা করেন মেসবাহ আহমেদ। এ স্মৃতি আলেখ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলার করুণ বাস্তবতায় ঈদের আগমনকে বর্ণনা করা হয় গভীর বেদনাময় ভাষায়—

‘ঈদের আহত চাঁদের গা বেয়ে যেন ঝরছে চাপ চাপ রক্ত। বাংলার আকাশ আজ লাল, মাটি আজ লাল...‘ওরে বাংলার মুসলিম তোরা কাঁদ/এনেছে এজিদ বাংলার বুকে মহররমের চাঁদ। এসেছে কাসেম, এসেছে সখিনা, সারা দেহে হায় তপ্ত খুন/ আজ নয় ঈদ, আজ কোটি কোটি মুখে ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন।’

এখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের বিশ্বাসঘাতকতার কথাও তুলে ধরা হয়। স্মৃতি আলেখ্যটি শেষ হয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান ‘রমজানের ওই রোজার শেষে’ কোরাসে পরিবেশনের মাধ্যমে।

অনুষ্ঠানমালার বৈচিত্র্য

ঈদের দিনের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয় বেলা ১টায়। বাংলা ও ইংরেজি খবরের পর প্রচার হয় ‘রক্তে রাঙা ঈদ’ নামের জীবন্তিকা। বদরুল হাসান রচিত এ জীবন্তিকায় ঢাকার দুই যুবক শরীফ ও কবীরের কথোপকথনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের বাস্তবতা। বলা হয়, লাখো মানুষের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে ঈদের আনন্দ উদযাপন করা অসম্ভব।

এছাড়া পুঁথিপাঠ, ছোটগল্প, যন্ত্রসংগীত, সৈয়দ আলী আহসানের কথিকা ইত্যাদি অনুষ্ঠানও প্রচার হয়। সন্ধ্যার অধিবেশনে ছিল বিশেষ সংগীতালেখ্য ‘রক্ত রাঙা ঈদুল ফিতর’, আশফাকুর রহমানের ‘অগ্নিশিখা’, ‘বজ্রকণ্ঠ’, নজরুলের কবিতা পাঠ, আবু তোয়াব খানের ‘পিন্ডির প্রলাপ’ এবং যুদ্ধের খবর।

রাত ৮টা ২৫ মিনিটে বাজানো হয় জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’। এরপর ইংরেজি অনুষ্ঠান, পল্লীগীতি ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান শেষে রাত সাড়ে ১০টায় শেষ হয় ঈদের দিনের সম্প্রচার।

১৯৭১ সালে বাঙালির কাছে ঈদুল ফিতর উৎসবের নয়, ছিল সংগ্রামের দিন। চারদিকে যখন যুদ্ধ, মৃত্যু ও ধ্বংসের বিভীষিকা, তখন আনন্দের আয়োজন স্বাভাবিকভাবেই ম্লান হয়ে গিয়েছিল। তবু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সে দিনকে ব্যবহার করেছিল এক ভিন্ন উদ্দেশ্যে—মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য নয়, বরং তাদের হৃদয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরো প্রজ্বলিত করার জন্য।

সেই ঈদের অনুষ্ঠান আজ ইতিহাসের অনন্য দলিল। সেখানে ঈদের চাঁদও যেন স্বাধীনতার প্রতীক্ষায় রক্তাক্ত আকাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বেতারের তরঙ্গে ভেসে আসা গান, কথিকা ও আহ্বান বাঙালিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল—আসল উৎসব হবে তখনই, যখন স্বাধীনতার সূর্য উদয় হবে বাংলাদেশের আকাশে।