বলিউডের প্রখ্যাত অভিনেতা ববি দেওল। একসময় যার নামেই ভরে উঠত সিনেমা হল। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘বরসাত’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। প্রথম সিনেমাতেই বাজিমাত। তরুণ, আকর্ষণীয় চেহারা, স্টাইল আর সহজ-সরল অভিনয়—সব মিলিয়ে মুহূর্তেই দর্শকের মন জয় করেন ববি। এরপর ‘সোলজার’, ‘বাদল’, ‘বিচ্চু’, ‘অজনবী’—একের পর এক বাণিজ্যিক হিট সিনেমার নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি।

তবে জীবনের পথ সবসময় মসৃণ থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ববির ক্যারিয়ারে নেমে আসে মন্দা। ২০০০-২০১০ সাল পর্যন্ত একের পর এক সিনেমা বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। সেই সঙ্গে কাজের প্রস্তাবও কমে আসে। একসময় এমনও অবস্থা হয় যে হাতে কোনো কাজই ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে ঘরে বসে কাটে সময়। যিনি একসময় বলিউডে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন, তাকেই কাজের আশায় প্রযোজক ও পরিচালকদের অফিসে ঘুরতে হয়—ভাবা যায়!

সেই কঠিন সময়ের স্মৃতিই এখন ববি দেওলের জীবনের অনুপ্রেরণার গল্প। এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি অকপটে বলেছেন, ‘একটা সময় আমি জীবনের সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। মনে হতো, সব শেষ। কিন্তু তখনই বুঝতে পারি, মানুষের জীবনে যতই অন্ধকার আসুক, একটা আলোর দিক তো থাকেই।’

অভিনেতা জানান, একদিন তার ছেলের কথাই তাকে নতুন করে সাহস জোগায়। সেই সাহসেই তিনি বেরিয়ে পড়েন কাজ খুঁজতে। নিজের অহং ভুলে, পরিচিতি ভুলে গিয়ে পরিচালকদের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন। ববি বলেন, ‘আমি অফিসে গিয়ে বলতাম—আমি ববি দেওল, দয়া করে একটা কাজ দিন।’

এ বিনয়ের মধ্যে ছিল তার লড়াই করার ইচ্ছা। তার মতে, ‘এতে কোনো দোষ নেই। অন্তত আমি গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করেছি, সেটা তারা মনে রাখবেন।’

ববি দেওলের এ স্পষ্টবাদিতা আর আত্মসম্মানবোধই তাকে আবারো ফিরিয়ে এনেছে আলোচনায়। দীর্ঘদিনের খারাপ সময় শেষে তিনি যেন খুঁজে পান নিজের ভেতরের সেই হারানো বিশ্বাস। ববি বলেন, ‘যখন হাতে কিছুই থাকে না, তখনই বোঝা যায় নিজের ভেতরে এমন কিছু একটা আছে, যার জন্যই শুরুটা এত ভালো হয়েছিল। ভেতর থেকে একটা আওয়াজ আসে—এখনো তোমার মধ্যে সেই জিনিসটা আছে। সেটাই তোমাকে আবার এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

আর সত্যিই তাই হয়েছে। প্রকাশ ঝা পরিচালিত ওয়েব সিরিজ ‘আশ্রম’ ববি দেওলের জীবনে নতুন সূর্যোদয় ঘটায়। সেই সিরিজ তাকে নতুন করে পরিচয় করায় তরুণ দর্শকের কাছে। চরিত্রের গভীরতা, সংযত অভিনয় আর উপস্থিতি—সব মিলিয়ে সমালোচকরাও তাকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করেন। এরপর ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অ্যানিমেল’-এ খলনায়কের চরিত্রে ববির দুর্দান্ত অভিনয় সাড়া ফেলে দেয় পুরো ভারতে। দর্শক ও সমালোচক উভয়েই প্রশংসায় ভরিয়ে দেন তাকে। আর ২০২৫ সালের ‘দ্য ব্যাডস অব বলিউড’-এর মাধ্যমে আবারো প্রমাণ করেছেন, সময় যতই বদলাক, প্রতিভা কখনো ম্লান হয় না।

একসময় যিনি বলেছিলেন, ‘দয়া করে একটা কাজ দিন’, সেই ববি দেওল আজ বলিউডের অন্যতম সম্মানিত অভিনেতা। তার গল্প শুধু একজন তারকার নয়, একজন মানুষেরও—যিনি হাল ছাড়েননি। জীবনের কঠিনতম সময়েও নিজের ভেতরের বিশ্বাসটা আঁকড়ে রেখেছিলেন। আর সেই বিশ্বাসই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে আলোয়, প্রশংসায় আর দর্শকের ভালোবাসায়।

ববি দেওলের জীবনের এ উত্থান-পতন আর পুনরাগমন যেন বলিউডের এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা—যেখানে পতন মানেই শেষ নয়, বরং নতুন করে ওঠে দাঁড়ানোর সুযোগ।

হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে অহিদুর রহমান