বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে গত এক দশকে যে ক’জন শিল্পী ভিন্ন আঙ্গিকের কাজ দিয়ে নিজেদের আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ইমন চৌধুরী। ব্যান্ড সংগীতের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা এ শিল্পী এখন একাধারে সংগীত শিল্পী, সংগীত পরিচালক, গিটারিস্ট ও সংগঠক। সম্প্রতি ব্লেন্ডারস চয়েস—দ্য ডেইলি স্টার ওটিটি ও ডিজিটাল কনটেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২৪-এ সেরা মিউজিক কম্পোজারের পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। আগামী মাসে হতে যাওয়া তার গানের দল বেঙ্গল সিম্ফনি নিয়ে চীন সফর ও প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের প্রস্তুতিসহ তার ক্যারিয়ারের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন অহিদুর রহমানের সঙ্গে
সেরা মিউজিক কম্পোজারের স্বীকৃতি
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ব্লেন্ডারস চয়েস—দ্য ডেইলি স্টার ওটিটি ও ডিজিটাল কনটেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২৪-এ সেরা মিউজিক কম্পোজারের স্বীকৃতি পান ইমন চৌধুরী। দেশের সংগীতাঙ্গনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এ আয়োজনের নাম ঘোষণা হওয়ার মুহূর্তটি ছিল তার জন্য এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।
এ অর্জন প্রসঙ্গে ইমন বলেন, ‘পুরস্কার সবসময়ই উৎসাহ দেয় সুন্দর ও ভালো কাজ করার জন্য। সেরা মিউজিক কম্পোজারের পুরস্কার পাওয়া অবশ্যই অনেক আনন্দের ছিল আমার জন্য। সবচেয়ে বড় কথা, এ রকম একটি ইভেন্টে অসাধারণ সব মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ—এটাও ভীষণ আনন্দের।’
তিনি আরো জানান, এ স্বীকৃতি শুধু তাকে আনন্দ দেয়নি, বরং আগামীর কাজের প্রতি দায়িত্ববোধও আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ একটি বড় মঞ্চ থেকে পাওয়া সম্মান শিল্পীর কাজকে নতুন মাত্রা দেয়, অনুপ্রেরণা দেয়।
কোক স্টুডিওর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা
কোক স্টুডিও বাংলার সঙ্গে কাজ করাটা ইমনের কাছে বিশেষ এক আনন্দের বিষয়। কারণ এখানে শিল্পীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়। তিনি মনে করেন, ‘আমি যেমনভাবে কাজ করতে চাই, ঠিক সেভাবেই তারা সাপোর্ট করে। এ রকম একটি প্লাটফর্ম থাকার কারণে আমরা আমাদের সংস্কৃতি ও কাজগুলো দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারছি।’ কোক স্টুডিওর গানগুলোয় তিনি শুধু নিজের সুর নয়, বরং দেশের শেকড়ের সংগীত ও বৈচিত্র্যকেও নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চান।
জনপ্রিয় গান ও নতুন অ্যালবাম
ইমনের ক্যারিয়ারে ‘কথা কইয়ো না’ ও ‘বারো মাসে বারো ফুল রে’ গান দুটি বড় মাইলফলক। এ গানগুলো তাকে শ্রোতাদের আরো কাছে নিয়ে এসেছে, তৈরি করেছে আলাদা জায়গা। তিনি মনে করেন, প্রতিটি সফল গান শুধু শিল্পীর ক্যারিয়ারকে এগিয়ে দেয় না, বরং নতুন কাজের অনুপ্রেরণাও জোগায়। এখন তিনি মনোযোগ দিয়েছেন নিজের প্রথম অ্যালবাম নিয়ে। এরই মধ্যে কিছু গান সম্পন্ন হয়েছে, বাকিগুলো তৈরি হচ্ছে ধীরে সুস্থে। তার বিশ্বাস, ‘সুন্দর করে গান না করতে পারলে শান্তি লাগে না। তাই ঠাণ্ডা মাথায় আস্তে আস্তে কাজ করছি।’ নতুন অ্যালবামে শ্রোতারা ভিন্ন স্বাদের কিছু খুঁজে পাবেন বলেই আশা করছেন তিনি।
বেঙ্গল সিম্ফনি: স্বপ্নের দল
শুরু থেকেই ব্যান্ড সংগীতে সক্রিয় ছিলেন ইমন। তাই তার কাছে একক কাজের চেয়ে দলবদ্ধভাবে কাজ করার আনন্দ অনেক বেশি। সে চিন্তা থেকেই গড়ে উঠেছে বেঙ্গল সিম্ফনি। এ প্লাটফর্মে দেশের আনাচে-কানাচে থাকা অসাধারণ প্রতিভাদের নিয়ে এক সৃজনশীল পরিবার গড়তে চান ইমন। ইমনের ভাষায়, ‘আমি একা নই, দলবদ্ধভাবে সংগীত করতে ভালোবাসি। টিম থাকলে ভালোবেসে অনেক কাজ করা যায়। ’
‘বাজি’: বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি
কোক স্টুডিও বাংলার আলোচিত গান বাজি ইমনের দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণের ফসল। তার পরিকল্পনা ছিল এমন একটি গান করার, যেখানে এক মঞ্চে থাকবে ছোট্ট একটি বাংলাদেশ। পাহাড়ের সুর থেকে শুরু করে সমতলের গান, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বাদ্যযন্ত্র থেকে আধুনিক ইনস্ট্রুমেন্ট—সব মিলিয়ে এক অনন্য সুরের সমন্বয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এ মাটিতে সবাই গুরুত্বপূর্ণ, সে পাহাড়ের মানুষ হোক বা সমতলের। তাই গানটিতে আমরা চেষ্টা করেছি, ঐক্যের বাংলাদেশকে ফুটিয়ে তুলতে।’ এ গানে লোকজ বাদ্যযন্ত্র, আদিবাসী সুর ও নৃত্য, মনিপুরী রিদমসহ নানা উপাদান ব্যবহার করেছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে বৈচিত্র্যের ভেতর ঐক্যের এক শক্তিশালী বার্তা।
আন্তর্জাতিক সফর ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
শিগগিরই চীনে যাচ্ছে বেঙ্গল সিম্ফনি। চীনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবেন তারা। এ সফর নিয়ে ইমন বলেন, ‘নিজের দেশের সুর বিশ্বের এত বড় প্লাটফর্মে উপস্থাপন করা সত্যিই বিশেষ অনুভূতি। আমরা চেষ্টা করব সেখানে সেরা প্রেজেন্টেশন দেয়ার।’ এছাড়া ইমন বর্তমানে বেশকিছু সিনেমার কাজ নিয়ে আলোচনা করছেন। বিজ্ঞাপন ও ব্যক্তিগত প্রজেক্ট নিয়েও তিনি সমান ব্যস্ত। তার লক্ষ্য, দেশের সংগীতকে শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত করে তোলা।
দলবদ্ধ গানে পছন্দ
ইমন চৌধুরী বিশ্বাস করেন, ভালো কাজ একা নয়—দলবদ্ধতার ভেতরেই জন্ম নেয় তার আসল সুর ও রূপ। তার গান শেকড়, ঐক্য ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। বেঙ্গল সিম্ফনির মঞ্চে বিভিন্ন প্রতিভার সমন্বয় তার সৃজনশীলতার মূল শক্তি। সামনের দিনে তার প্রতিটি সৃষ্টি যেন বাংলার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে, এটাই ইমনের প্রত্যাশা।










