প্রাত্যহিক জীবনে পরিবর্তন একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং এটা ধ্রুব সত্যি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই নতুন রূপ ধারণ করে। পরিবর্তন হয় মানুষের জীবন ও তার রুচির। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরনোকে পেছনে ফেলে নতুনত্বের স্বাদ গ্রহণ করতে চায় সবাই। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে মানুষের জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জীবন হয়েছে সহজ ও মসৃণ।

এখন দুর্বোধ্য বলতে কিছু নেই। সবই যেন হাতের নাগালে। হাত বাড়ালেই সব পাওয়া যায়। পরিবর্তন আর প্রযুক্তির আগমনে বিনোদন দুনিয়ায়ও পড়েছে এর প্রভাব। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার দরুন মানুষের রুচি ও স্বাদের মধ্যেও এসেছে পরিবর্তন। পরিবর্তিত সময়ে বিনোদন জগতের মানুষ আগের চেয়ে স্বাধীন ও সহজভাবে বিনোদন পাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটা এখন সবার কাছেই স্পষ্ট। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেছে বিনোদন গ্রহণের ক্ষেত্র। একটা সময় সিনেমা হল অথবা টিভির পর্দাকে বিনোদনের খোরাক হিসেবে নেয়ার মানুষেরও রুচির পরিবর্তন হয়েছে।

রাস্তার যানজট, টিকিট কাটার ঝামেলা, সময় বেঁধে সিনেমা দেখা, এসব নিয়ম থেকে যেন মানুষ বেরিয়ে আসতে চাইছে। মানুষের কথা ভেবে অনলাইন প্লাটফর্ম দর্শককে দিয়েছে বিনোদনের স্বাধীনতা। বড় পর্দা বা ছোট পর্দা থেকে মুখ ফিরিয়ে দর্শক যেন মুখিয়ে পড়ছে অনলাইন স্ট্রিমিং সাইটের দিকে। বিনোদনকে আরো বেশি হাতের নাগালে আনার জন্য ডিজিটাল স্ট্রিমিং সাইট যেমন চরকি, হইচই, আইস্ক্রিন মাধ্যমগুলো ক্রমেই টিভি চ্যানেলগুলোর জায়গা দখল করছে। এ প্লাটফর্মগুলো ডাউনলোডের ঝামেলা ছাড়াই যেকোনো কনটেন্ট দেখার ক্ষেত্রে সুবিধা দিচ্ছে।

এদিকে এসব অনলাইন প্লাটফর্মের দিন দিন জনপ্রিয়তা বাড়ছে। পক্ষান্তরে বিনোদনের সেরা মাধ্যম দেশের সিনেমা হলগুলো ক্রমাগত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দর্শকখরায় ভুগছে সিনেমা হলগুলো। দেশের সিনেপ্লেক্স ব্যতীত সিঙ্গেল পর্দাগুলো ব্যবসা করতে না পেরে শোনাচ্ছেন অসন্তুষ্টির বাণী।

গত বছর ঢাকাই সিনেমার অবস্থা দু-একটা সিনেমা ছাড়া খুব একটা ভালো ছিল না। এ বছরের শুরুতে বেশ কয়েকটা সিনেমা মুক্তি পায়। যার একটিও বাণিজ্যিকভাবে সাফল্য পায়নি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মুক্তি পায় চারটি সিনেমা। ‘মধ্যবিত্ত’, ‘মেকআপ’, ‘কিশোর গ্যাং’, ‘রিকশা গার্ল’। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মুক্তি পায় আরো দুটি সিনেমা ‘বলি’ ও ‘দায়মুক্তি’। জানুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া চারটি সিনেমা আশানুরূপ দর্শক পায়নি। ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া দুই সিনেমায়ও দর্শকের আগ্রহ নেই।

এছাড়া এবারের ভালোবাসা দিবসে ‘জলে জ্বলে তারা’ ও ‘ময়না’ নামের সিনেমা দুটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। এ দুই সিনেমাও যে তেমন দর্শককে নাড়া দিতে পেরেছে এমনটা নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন মানুষ সিনেমা হলবিমুখ হয়ে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে সিনেমা হলে এসে সিনেমা দেখতে চায় না। আবার কেউ কেউ বলছেন, সিনেমা হলে দর্শকখরার জন্য দায়ী ভালো কনটেন্ট না থাকা। কনটেন্ট ভালো হলে প্রযুক্তির যতই উন্নয়নই ঘটুক না কেন, মানুষ সিনেমা হলে এসে সিনেমা দেখবে।

বিষয়টি নিয়ে হইচই কান্ট্রি ডিরেক্টর সাকিব আর খান বণিক বার্তাকে জানান, প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিনোদনের চাহিদা ও অভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে এটা ঠিক। কিন্তু তার মানে এই নয়, সিনেমা হলের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি ফুরিয়ে গেছে। হলে দর্শক বড় পর্দায় ছবি উপভোগ করেন, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান এবং সামাজিক সংযোগ তৈরি করেন। ব্যাপারটা এখনো সামগ্রিক অভিজ্ঞতা, যা অনলাইন প্লাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়। হলের সিনেমা নিয়ে তিনি বলেন, ‘সিনেমা হল তো দিন দিন কমে যাচ্ছে। সিঙ্গেল স্ক্রিন সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ভালো সিনেমা যেমন হলে প্রয়োজন তেমন প্রয়োজন অর্থ লগ্নি, প্রদর্শন, প্রচার, ডিস্ট্রিবিউশন। সব কিছুই আসলে একে অন্যের পরিপূরক।’

অনলাইন প্লাটফর্ম আর সিনেমা হলের পার্থক্য বলতে গিয়ে সাকিব আর খান বলেন, ‘দর্শক হলে গিয়ে সিনেমা দেখে একটা অন্য রকমের এক্সপেরিয়েন্সের জন্য, যেটা ফোন, ল্যাপটপ বা টেলিভিশনের পর্দায় দেখে সম্ভব নয়। তবে আমাদের এ ধারণাও ঠিক নয় যে অনলাইন প্লাটফর্মের জন্য হলে দর্শক যাচ্ছে না। বরং মনে হয়, এ প্লাটফর্মের গল্পনির্ভর কনটেন্টের কারণে হলেও এখন বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি গল্পনির্ভর সিনেমাও বেশি হচ্ছে।’

বিষয়টি নিয়ে ওটিটি প্লাটফর্ম দীপ্ত প্লের প্রধান নাসিম আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিনেমা ও অনলাইন স্ট্রিমিং ওটিটি প্লাটফর্ম কিংবা অন্যান্য মাধ্যম সিনেমা হলে দর্শকখরার কারণ নয়। কারণ যখন কভিডের সময় মানুষ অনলাইনে অভ্যস্ত হয় তখন আমরা মনে করেছিলাম, সবকিছুই অনলাইন-নির্ভর হয়ে যাচ্ছে। যখন কভিড কমে গিয়ে সব স্বাভাবিক হয়, তখন ‘তুফান’সহ বেশ কয়েকটা ভালো সিনেমা এলো। তখন আমরা সিনেমাগুলো পরিবার নিয়ে দেখতে গিয়েছি। আমি নিজে একটা ওটিটি প্লাটফর্মের দায়িত্বে আছি। অনলাইন প্লাটফর্মের সঙ্গে এত বছর ধরে থেকেও পরিবার ও কলিগদের নিয়ে হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছি। হলে সিনেমার দেখার যে একটা পরিবেশ এটা কখনো অনলাইনে পাওয়া যাবে না। সিনেমা হল ও অনলাইন প্লাটফর্ম কখনই একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।

সিনেমা হলে দর্শকখরার কারণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে হিরো ও হিরোইনের অভাব, একজনের বিকল্প আরেকজন নেই। এছাড়া ভালো কনটেন্টের অভাব তো আছেই। যদি কনটেন্ট ভালো হয়, অবশ্যই হলে গিয়ে সিনেমা দেখবেন। আমাদের ভালো কনটেন্টের পাশাপাশি বিকল্প আর্টিষ্ট তৈরি করতে হবে।’

এ ব্যাপারে বণিক বার্তার কথা হয় পরিচালক সমিতির মহাসচিব শাহিন সুমনের সঙ্গে। তিনি সিনেমা হলে দর্শকখরা নিয়ে নানা কারণ তুলে ধরেন। শাহিন সুমন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিনেমা হলে দর্শক কম হওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। শুধু আমাদের কনটেন্ট ভালো হচ্ছে না, তা নয়। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি যুগে হাতের নাগালে সব পাওয়া যাচ্ছে। চাইলেই বাসায় বসে অথবা বাইরে যেকোনো জায়গায় অনলাইনে কনটেন্ট দেখা যায়। কিন্তু সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় দরকার হয়, আসা যাওয়ার ভাড়া, সিনেমা দেখতে টিকিট, এ সবকিছু মানুষ এখন করতে চায় না, কারণ মানুষ সহজেই সবকিছু হাতের নাগালে পাচ্ছে।’

এছাড়া মানুষ বর্তমানে জীবন-জীবিকা বা তাদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। এ ব্যস্ততার সময় সিনেমা দেখার জন্য ৪-৫ ঘণ্টা সময় বের করা বর্তমান অবস্থায় কঠিন। এছাড়া সিনেমা দেখার জন্য হলে যে পরিবেশ দরকার ভেতর ও বাইরে, আমাদের দেশের সিনেমা হলে তেমনটা কম। যার কারণে মানুষ ধীরে ধীরে সিনেমা হলবিমুখ হচ্ছে।