স্বাধীনতা-পরবর্তী চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রাথমিক দিনগুলো থেকে শুরু করে সমকালীন পুনর্ব্যাখ্যার পর্যায় পর্যন্ত, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে নারীরা এক দীর্ঘ ও অসম পথ অতিক্রম করেছেন। প্রায় অদৃশ্য এক উপস্থিতি থেকে ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হওয়ার এ যাত্রা সহজ ছিল না। এ বিবর্তন শুধু চলচ্চিত্রভাষার রূপান্তরই প্রতিফলিত করেনি, একই সঙ্গে একটি জাতির নিজস্ব অতীতের সঙ্গে তার সম্পর্কের ক্রমপরিবর্তনেরও গভীর প্রতিচ্ছবি।

যুদ্ধোত্তর প্রেক্ষাপট: ১৯৭২ থেকে সত্তরের দশকের শেষ ভাগ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরই চলচ্চিত্র শিল্প সদ্য অর্জিত বিজয়ের তীব্রতা ও আবেগকে ধারণ করতে শুরু করে। ‘ওরা ১১ জন’ ও ‘ধীরে বহে মেঘনা’র মতো চলচ্চিত্রগুলো মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী তুলে ধরার প্রাথমিক প্রয়াস হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু এসব সিনেমায় অনুপস্থিত ছিল নারীকণ্ঠ।

15

চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘ওরা ১১ জন (১৯৭২)’ সিনেমায় কাহিনীর চালিকাশক্তি প্রায় সম্পূর্ণভাবে পুরুষ গেরিলা যোদ্ধাদের ঘিরে আবর্তিত। নারীরা সেখানে উপস্থিত হন ক্ষণিকের জন্য। নীরবে অপেক্ষমাণ মা হিসেবে, দ্বারে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী হিসেবে কিংবা নামহীন সহিংসতার শিকার হিসেবে। তারা স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে নন, বরং পুরুষ বীরত্বের আবেগঘন সম্প্রসারণ হিসেবে বিদ্যমান ছিলেন।

একইভাবে আলমগীর কবির নির্মিত ‘ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩)’ সিনেমাটি অপেক্ষাকৃত কাব্যিক ও আত্মমুখী ভঙ্গি উপস্থাপন করলেও তা এ লিঙ্গভিত্তিক ভারসাম্যহীনতাকে মৌলিকভাবে ভেঙে দিতে পারেনি। নারী চরিত্ররা শোক ও ক্ষতির ভার বহন করে, কিন্তু তাদের অন্তর্জগৎ অনাবিষ্কৃতই থেকে যায়। তাদের যন্ত্রণাকে নান্দনিক করে তোলা হয়, কিন্তু তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ বা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয় না।

এ সময়কার সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতা প্রকাশ পায় যৌন সহিংসতার চিত্রায়ণে। বীরাঙ্গনাদের খুব কম ক্ষেত্রেই কাহিনীর ধারাবাহিকতা প্রদান করা হয়েছে। অধিকাংশ সময়ই তারা ট্র্যাজিক পরিণতির প্রতীক হয়ে তাদের গল্প ট্রমার সীমা অতিক্রম করে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাননি।

স্মৃতির গৃহস্থালীকরণ (আশি ও নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগ)

স্বাধীনতা-উত্তর তাৎক্ষণিক সময়ের যুদ্ধকেন্দ্রিক বয়ান নির্মাণের তাগিদ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এলে চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের উপস্থিতিও ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসে। আশি ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে যুদ্ধ যেন পটভূমির অন্তরালে সরে যায় এবং তার সঙ্গে সঙ্গে নারীর উপস্থিতি আরো সংকুচিত হয়ে পড়ে।

যখনই মুক্তিযুদ্ধ পর্দায় ফিরে এসেছে, যেমন হমায়ূন আহমদের পরিচালনায় ‘আগুনের পরশমণি (১৯৯৪)’ সিনেমায় তা পুনর্গঠিত হয় গৃহস্থ জীবনের অন্তরঙ্গ পরিসরে। এ চলচ্চিত্রে একটি পরিবারের চোখ দিয়ে যুদ্ধের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা প্রতিফলিত হয়েছে। আর সেই গৃহ পরিসরের ভেতরে নারীদের দৃশ্যমান করে তোলা হয়েছে। রাত্রী, অপালা কিংবা সুরমার চরিত্রের ভেতরে আমরা তা-ই দেখতে পাই।

মা, মেয়ে, বোন—এসব চরিত্র ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। তারা লালন করে, উদ্বিগ্ন হয়, সহ্য করে। কিন্তু তারা ইতিহাসকে পরিচালিত করে না। এ পর্বটি এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে—নারীরা আর সম্পূর্ণ অদৃশ্য নন, কিন্তু তাদের ভূমিকা তখনো সীমারেখায় আবদ্ধ। তারা স্মৃতির রক্ষক, কিন্তু সেই স্মৃতি নির্মাণের অংশীদার নন। যুদ্ধ তাদের চারপাশে ঘটে, তারা তাকে রূপ দেন না, বরং তাকে ধারণ করেন।

স্মৃতি, সাক্ষ্য ও ক্ষমতার প্রান্তসীমা (নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগ থেকে দুই হাজারের দশক)

নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগ এবং দুই হাজারের দশকের সূচনা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রভাষায় এক নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটায়। আংশিকভাবে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতাদের প্রচেষ্টা ও মৌখিক ইতিহাসের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এ পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে।

তারেক মাসুদ ও ক্যাথারিন মাসুদ পরিচালিত ‘মুক্তির গান (১৯৯৫)’ ও ‘মুক্তির কথা (১৯৯৯)’ প্রামাণ্যচিত্র দুটি এ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। ‘মুক্তির গান’-এ নারীরা একটি ভ্রাম্যমাণ সাংস্কৃতিক দলের অংশ হিসেবে উপস্থিত হন, যেখানে তারা সংগীত ও পরিবেশনার মাধ্যমে যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অবদান রাখেন। যদিও তারা তখনো কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দু নন, তবে প্রান্তিকও নন, তারা অংশগ্রহণকারী।

14

‘মুক্তির কথা’ একে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। এটি গ্রামীণ বাংলায় ফিরে গিয়ে সাধারণ মানুষকে, যার মধ্যে নারীরাও অন্তর্ভুক্ত, তাদের ১৯৭১-এর স্মৃতিচারণের সুযোগ করে দেয়। এখানে প্রথমবারের মতো নারীরা নির্মাতার কল্পনায় নির্মিত চরিত্র হিসেবে নন, বরং নিজেদের ইতিহাসের বর্ণনাকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

কল্পকাহিনীনির্ভর চলচ্চিত্রে, যেমন হমায়ূন আহমদ পরিচালিত ‘শ্যামল ছায়া (২০০৪)’ সিনেমায় আশালতা কিংবা রাত্রির চরিত্রকে আবেগঘন করে তোলা হয়েছে। তারা ঘটনার সূচনা করে না ঠিকই, কিন্তু ঘটনাপ্রবাহের প্রতিক্রিয়া জানায়।

তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মাটির ময়না (২০০২) বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীদের অবস্থান নির্ধারণ করে। আয়েশা চরিত্রটি সেই গল্পের কেন্দ্রে না থাকলেও গল্পে গুরুত্ব বজায় রেখেছে।

প্রতিরোধের সক্রিয় শক্তি হিসেবে নারী (২০১০-১৮)

২০১০-এর দশকে এসে নির্মাতারা পূর্ববর্তী বয়ানের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে শুরু করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের ভেতরে নারীর ভূমিকা নতুনভাবে কল্পনা ও নির্মাণ করেন।

নাসিরউদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত ‘গেরিলা (২০১১)’ চলচ্চিত্রটি এক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র বিলকিস বানু একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা। তিনি শহুরে গেরিলা যুদ্ধের জটিলতায় নিজেকে খাপ খাইয়ে নেন, গোয়েন্দা কার্যক্রমে অংশ নেন এবং দখলদার শক্তির নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন অদম্য দৃঢ়তা ও সাহস নিয়ে।

সমসাময়িক কালে লিসা গাজী নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘রাইজিং সাইলেন্স (২০১৯) ও আফসান চৌধুরী নির্মিত ‘তাহাদের যুদ্ধ’র মতো প্রামাণ্যচিত্রগুলো বীরাঙ্গনাদের গল্পকে সামনে নিয়ে আসে। অন্যদিকে শামীম আকতার পরিচালিত ‘রিনা ব্রাউন’ চলচ্চিত্রে নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে ১৯৭১-এর দীর্ঘস্থায়ী ছায়াকে উন্মোচন করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় চরিত্রে নারী (২০১৯ থেকে বর্তমান)

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির দিকে অগ্রসর হয়েছে, যেখানে নারীদের আর ব্যতিক্রম হিসেবে নয়, বরং ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য ও কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

16

হৃদি হক পরিচালিত ১৯৭১-এর সেই সব দিন (২০২৩)-এর মতো চলচ্চিত্রগুলো অন্তরঙ্গ, চরিত্রনির্ভর বয়ানের মাধ্যমে যুদ্ধকে পুনরায় প্রত্যক্ষ করে, যেখানে নারীরা কাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক স্থানে অবস্থান করেন। একইভাবে ধ্রুব হাসান পরিচালিত ‘ফাতিমা (২০২৪)’ সিনেমা অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক সেতুবন্ধ নির্মাণ করে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধকালীন এক নারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে সমকালীন সংগ্রামের সংযোগ স্থাপন করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে নারীর উপস্থাপনার বিবর্তন কোনো সরলরৈখিক প্রক্রিয়া নয়। এটি নীরবতা, অগ্রগতি, বিকৃতি ও সংশোধনের এক জটিল সমান্তরাল পথচিহ্নে চিহ্নিত। প্রথম দিকে বাকরুদ্ধ সত্তা হিসেবে তাদের অনুপস্থিতি থেকে ধীরে ধীরে কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হওয়া পর্যন্ত, বাংলাদেশের চালচ্চিত্রিক কল্পনায় নারীরা অতিক্রম করেছেন এক কঠিন ও বন্ধুর যাত্রাপথ।