এ কাজে যুক্ত হয়েছে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র সংরক্ষণাগার (এনএফএআই) বা ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অব ইন্ডিয়া। সরকারি এ সংস্থা ঋত্বিক ঘটকের সব চলচ্চিত্র পুনরুদ্ধার (রিস্টোর) করেছে। পুনরুদ্ধারের আওতায় এসেছে তার আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, শর্টফিল্ম, প্রামাণ্যচিত্র ও অসমাপ্ত প্রকল্প।

এ আট পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে মেঘে ঢাকা তারা, অযান্ত্রিক, কোমল গান্ধার, সুবর্ণরেখা ও তিতাস একটি নদীর নাম। সম্প্রতি এনএফএআইয়ের মূল সংস্থা ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (এনএফডিসি) লন্ডনের ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে সিনেমাগুলোর প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এছাড়া ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্র উৎসব ইল সিনেমা রিত্রোভাতোয়ও এ প্যাকেজ প্রদর্শিত হয়েছে।

ঋত্বিকের সিনেমার অনেক প্রিন্ট আগে থেকেই পুনের এনএফএআই কেন্দ্রে সংরক্ষিত ছিল। কিছু প্রিন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে কলকাতার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য চলচ্চিত্র সংরক্ষণাগার থেকে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ফিল্ম হেরিটেজ মিশনের আওতায় পরিচালিত এ পুনরুদ্ধার প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন খ্যাতনামা চিত্রগ্রাহক অভীক মুখোপাধ্যায়।

14

ঋত্বিক সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ভারতের চলচ্চিত্র ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে মৌলিক নির্মাতাদের একজন। শুধু বিষয়বস্তুর জন্য নয়, তার সৃষ্ট দৃশ্যভাষাও ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র, যা অন্য কোনো নির্মাতা অনুসরণ করেননি।’

পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অভীক জানান, প্রথমে বয়সজনিত ক্ষতি বা অনুপযুক্ত সংরক্ষণের কারণে নষ্ট হওয়া প্রিন্টগুলো পুনরুদ্ধার করা হয়। এরপর ডিজিটাল রিস্টোরেশনের মাধ্যমে ধুলা ও আঁচড়ের দাগ মুছে ফেলা হয়। তারপর আসে ডিজিটাল ইন্টারমিডিয়েট (ডিআই) ধাপ, যেখানে চিত্রগ্রাহকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মূল চিত্রগ্রাহক জীবিত থাকলে তিনি কাজটি করেন, না থাকলে চলচ্চিত্র ও তার সময়কাল সম্পর্কে জানেন এমন কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

ডিআইয়ের কাজের পাশাপাশি পুনরুদ্ধার হওয়া সিনেমাগুলোর চূড়ান্ত মান যাচাইও করেছেন অভীক। তার ভাষায়, ‘পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দল বিভিন্ন দৃশ্য নিয়ে কাজ করে। তাই শেষ পর্যন্ত পুরো কাজটি একসঙ্গে কেমন দাঁড়িয়েছে, তা দেখার জন্য একজনের প্রয়োজন হয়।’

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্র পুনরুদ্ধারের মূল দর্শন হলো সময়ের ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করলেও চলচ্চিত্রের মৌলিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখা। অভীক মুখোপাধ্যায় জানান, পুরনো সিনেমাকে অত্যন্ত কনট্রাস্টযুক্ত বা অতিরিক্ত পরিষ্কার করে তোলা উচিত নয়।

তিনি বলেন, ‘আলোকসজ্জা বা কম্পোজিশনের কোনো সীমাবদ্ধতা থাকলে তা পরিবর্তন করা উচিত নয়। বরং সে সময়ের চলচ্চিত্রের ধরন ও ব্যবহৃত ফিল্ম স্টকের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে সাম্যাবস্থা রক্ষা করতে হয়। কখনো কিছু খামতি বা ধুলার উপস্থিতিও সময়ের সাক্ষ্য বহন করে। তাই শুধু সময়ের সঙ্গে তৈরি হওয়া ক্ষয়ক্ষতিই দূর করা উচিত।’

পুনরুদ্ধারের মূল লক্ষ্য হলো চলচ্চিত্রটি মুক্তির সময় যেমন ছিল, সে রূপকেই ফিরিয়ে আনা। অতীতে প্রেক্ষাগৃহে ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা থেকে এ বিষয়ে অভীকের সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আমি মেঘে ঢাকা তারার চিত্রগ্রাহক দীনেন গুপ্তর মতো অনেকের সঙ্গে দেখা করেছি, যারা ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে কাজ করেছেন। আবার চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্রর সঙ্গেও পরিচয় ছিল। যদিও তিনি ঘটকের সঙ্গে কাজ করেননি, তবু সে সময়ের সাদা-কালো চিত্রগ্রহণ সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান ছিল।’

রেইনকোট, দোসর, অক্টোবর, সর্দার উধম-এর মতো সিনেমার চিত্রগ্রাহক ছিলেন অভীক। ফলে বিষয়গুলো তিনি গভীরভাবে বোঝেন। তিনি জানান, ক্লোজ-আপে বিভিন্ন ধরনের লেন্স ব্যবহার করতেন ঋত্বিক, যা ভারতীয় মূলধারার সিনেমার গ্ল্যামারাস ক্লোজআপ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তার ক্লোজআপগুলো অনেক বেশি তীক্ষ্ণ ও অস্বস্তিকর। আবার একক চরিত্রকে ঘিরে বিশাল নেগেটিভ স্পেস তৈরি করতেও তিনি বিশেষ ধরনের লেন্স ও কম্পোজিশন ব্যবহার করতেন।

অভীক বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ সবুজ ও নদীমাতৃক। সেখান থেকে শুরু করে ঘটক তার গল্পগুলোকে সম্পূর্ণ অনুর্বর ভূদৃশ্যে নিয়ে গেছেন। এ বৈপরীত্য অত্যন্ত তীব্র। তিনি পাহাড়ও খুব ভালোবাসতেন, আর কোমল গান্ধার ও মেঘে ঢাকা তারাসহ বিভিন্ন সিনেমায় পাহাড়ের ব্যবহার করেছেন।’

এ সবকিছুর মৌলিকত্ব বজায় রেখে সিনেমা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। অভীক মুখোপাধ্যায়ের মতে, পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে দর্শক আবারো উপলব্ধি করতে পারবেন ঋত্বিক ঘটকের সেই অনন্য আখ্যানভঙ্গি, যা তার চলচ্চিত্রকে এত গভীরভাবে আবেগময় ও স্মরণীয় করে তুলেছে।

স্ক্রল ডটইন অবল্বনে মাহমুদুর রহমান