টেলিভিশন নাটক একসময় ছিল বিনোদনের অন্যতম প্রধান উৎস। নব্বইয়ের দশক কিংবা তার আগের প্রজন্মের জন্য নাটক শুধু একটি বিনোদন নয়, বরং ছিল সামাজিক যোগাযোগেরও মাধ্যম। সেই সময়ের জনপ্রিয় নাটকগুলো—‘কোথাও কেউ নেই’, ‘বহুব্রীহি’, ‘আজ রবিবার’, ‘অয়োময়’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ মানুষকে টেলিভিশনের সামনে একত্র করত। সন্ধ্যা নামলেই পরিবার-পরিজন সবাই টেলিভিশনের সামনে বসে যেত। পরের দিন স্কুল-কলেজ কিংবা অফিসে আলোচনার অন্যতম বিষয় হতো সে নাটক। নাটকের গল্পে থাকত হাসি-কান্না, টানাপড়েন, সমাজের প্রতিচ্ছবি—যা সবাইকে ছুঁয়ে যেত।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাটকের জৌলুস যেন ফিকে হয়ে গেছে। এখনকার নাটক অনেকের কাছে আর ‘সবার বিনোদন’ নয়, বরং হয়ে পড়েছে বিচ্ছিন্ন কিছু ধারায় সীমাবদ্ধ। কখনো কেবল কমেডি, কখনো অতিরিক্ত প্রেমকেন্দ্রিক, আবার কখনো অযথা চটকদার গল্প। দর্শক ও সমালোচকদের মতে, এ পরিবর্তনই ধীরে ধীরে নাটক থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

একান্নবর্তী গল্পের অভাব

বাংলাদেশী নাটকের আসল শক্তি ছিল একান্নবর্তী গল্প। যৌথ পরিবারের সুখ-দুঃখ, আত্মীয়তার বন্ধন, প্রতিবেশীর টানাপড়েন এসব গল্প ছিল দর্শকের জীবনেরই অংশ। দর্শক নাটকে নিজেদের খুঁজে পেতেন। কিন্তু এখনকার নাটক সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে বিলাসবহুল শুটিং হাউজ বা কৃত্রিম লোকেশনে। চরিত্ররা প্রায় সবাই উচ্চবিত্ত, গল্পে থাকে চটকদার উপস্থাপন, কিন্তু বাস্তব জীবনের টানাপড়েন অনুপস্থিত। ফলে সাধারণ দর্শক মনে করেন—নাটক আর তাদের কথা বলে না।

44

বিদেশমুখী প্রযোজনা ও একঘেয়েমি

কয়েক বছর ধরে নির্মাতাদের মধ্যে বিদেশে গিয়ে নাটকের শুটিং করার প্রবণতা বেড়েছে। একসঙ্গে অনেক নাটক একই লোকেশনে তৈরি হওয়ায় বৈচিত্র্যের বদলে এসেছে একঘেয়েমি। দর্শক বারবার একই দৃশ্য, একই চরিত্র আর একই ধরনের রোমান্টিক গল্প দেখতে দেখতে বিরক্ত হচ্ছেন। নির্মাণ ব্যয় বাড়লেও গল্পের মান বাড়ছে না। বরং বিদেশী দৃশ্য অনেকের কাছে অচেনা মনে হয়, যা দর্শককে গল্প থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

অশ্লীলতা ও বাজে সংলাপের বেড়াজাল

আজকের নাটকের অন্যতম বড় সমালোচনা অশ্লীলতা ও দ্ব্যর্থপূর্ণ সংলাপ। কৌতুকের নামে নারী চরিত্রকে অপমান করা, অপ্রাসঙ্গিক রোমান্স কিংবা বাজারি সংলাপ নাটকের মানকে করছে নিচ। যে নাটক আগে পরিবার নিয়ে বসে দেখা যেত, এখন অনেক দর্শক বলে, বাচ্চাদের সামনে বসে নাটক চালানোই যায় না। একসময়কার নাটকে সংলাপে ছিল কাব্যিকতা, দার্শনিক ভাবনা আর জীবনের গভীরতা। এখন সেখানে ভেসে বেড়ায় সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডি বাক্য বা সস্তা হাসির প্রচেষ্টা।

দর্শক হারাচ্ছে নাটক

একসময় ঈদ বা জাতীয় দিবস মানেই ছিল টিভি নাটকের বিশেষ আয়োজন। এখন সে জায়গা দখল করে নিয়েছে ওয়েব সিরিজ, সিনেমা বা ইউটিউব কনটেন্ট। তরুণরা ঝুঁকছেন ডিজিটাল প্লাটফর্মের দিকে, মধ্যবয়সীরা দুর্বল গল্পে আগ্রহ হারাচ্ছেন আর প্রবীণরা মনে করছেন নাটক এখন তাদের অভিজ্ঞতা বা আবেগকে ছুঁতে পারছে না।

গুণী নাট্যকার ও পরিচালকের অভাব

বাংলাদেশী নাটকের সোনালি যুগে ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ, সেলিম আল দীন, ইমদাদুল হক মিলনের মতো নাট্যকাররা। তাদের লেখা নাটক কালজয়ী হয়ে আছে। আজকের দিনে সেই মানের লেখক পাওয়া যায় না বললেই চলে। এখন গল্প লেখা হয় মূলত ভিউ আর জনপ্রিয়তার দৌড়ের জন্য। পরিচালকরাও সময় নিয়ে একটি নাটক নির্মাণের বদলে সপ্তাহে একাধিক নাটক বানাতে ব্যস্ত। এতে নাটক হারাচ্ছে গভীরতা, চরিত্র হারাচ্ছে প্রাণ।

দর্শকের প্রত্যাশা কোথায়?

দর্শক এখনো নাটক ভালোবাসেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তারা চান বাস্তবমুখী গল্প, শালীন সংলাপ ও সম্পর্কিত চরিত্র।

ফিরবে কি সেই সোনালি দিন?

টেলিভিশন নাটক এখনো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম অঙ্গ। যদি নির্মাতারা দর্শকের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হন, তবে নাটক আবারো তার পুরনো জায়গায় ফিরে যেতে পারে। প্রয়োজন মানসম্মত গল্প, মেধাবী নাট্যকার, সময় নিয়ে নির্মাণ ও সর্বোপরি দর্শককেন্দ্রিক চিন্তা। যদি নাটক আবার জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারে, তবে হয়তো সেই সোনালি দিন আবার ফিরবে, যখন সন্ধ্যা নামলেই পুরো পরিবার একসঙ্গে বসে যেত টেলিভিশনের সামনে।