এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হওয়ার পর যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক বন্দি ২২ বছর ধরে কারাগারের ভেতরেই নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। কারা কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ এ সময়ে তিনি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ পেয়েছেন। শুধু তিনিই নন, দেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে ৩২ জন এইচআইভি আক্রান্ত বন্দি রয়েছেন। জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) দেয়া হচ্ছে।
তবে সামাজিক বৈষম্য ও হয়রানির আশঙ্কায় অনেক বন্দি কারাগারে প্রবেশের সময় নিজেদের এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করেন না। ফলে তাদের একটি অংশ শনাক্ত ও চিকিৎসার বাইরে থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
কারা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৩২ জন এইচআইভি আক্রান্ত বন্দি রয়েছেন। কারা কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। জেল কোড অনুযায়ী আলাদা খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীও সরবরাহ করা হয়।
দেশের ৩৩টি কারাগারে বর্তমানে এইচআইভি পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো বন্দির মধ্যে সংক্রমণের সন্দেহ দেখা দিলে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হলে কারা কর্তৃপক্ষের প্রচলিত ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী তাকে পৃথক রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। জাতীয় এইচআইভি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় আক্রান্ত বন্দিদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং এআরটি দেয়া হচ্ছে।
কারাগারে চিকিৎসাধীন কোনো এইচআইভি আক্রান্ত বন্দি জামিনে মুক্তি, খালাস বা সাজা শেষে বের হলে তার চিকিৎসা যাতে বন্ধ না হয়, সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়, যাতে মুক্তির পরও তিনি নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পেতে পারেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইচআইভি শনাক্তকরণ, সচেতনতা ও চিকিৎসায় ঘাটতি থাকায় দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এখনো চ্যালেঞ্জের। এ ভাইরাস ধীরে ধীরে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে আক্রান্ত ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তবে নিয়মিত এআরটি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
জাতিসংঘের এইডস-বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইডসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে এইচআইভি সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম হলেও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত পরীক্ষা ও শনাক্তকরণ কার্যক্রম পর্যাপ্ত না হলে আক্রান্তদের একটি অংশ অজান্তেই চিকিৎসার বাইরে থেকে যেতে পারেন। এতে তাদের নিজের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ সংস্পর্শে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও থেকে যায়। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি কারাগারের মতো আবদ্ধ পরিবেশেও নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এইচআইভির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসার আওতায় আনা। চিকিৎসার বাইরে থাকলে আক্রান্ত ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ে। এছাড়া অন্যদের মধ্যেও এইচআইভি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কারাগারের মতো আবদ্ধ পরিবেশে নিয়মিত পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। আক্রান্ত বন্দিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের গোপনীয়তা ও মানবিক মর্যাদাও রক্ষা করতে হবে।’
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারাগারে মোট বন্দি ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। এর বিপরীতে বর্তমানে বন্দি রয়েছেন ১ লাখ ২ হাজার ১৮০ জন, যা ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৫৭ হাজার বেশি। অতিরিক্ত বন্দির চাপে কারাগারগুলোর আবাসন, খাবার, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে। ধারণক্ষমতার তুলনায় এত বেশি বন্দি থাকায় স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা ও অতিরিক্ত বন্দির চাপের কারণে বিভিন্ন রোগ সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায় আনা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কারাগারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জোরদার এবং নিয়মিত পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
এইচআইভি আক্রান্ত বন্দিদের চিকিৎসায় কারাগারগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থাপনা রয়েছে বলে জানান কারা উপমহাপরিদর্শক (হেলথ) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আখতার হাসিব দেওয়ান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে ৩৩টি কারাগারে এইচআইভি পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। জাতীয় এইচআইভি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় আক্রান্ত বন্দিদের নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এআরটি, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি ব্র্যাকের সহযোগিতায় সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক বৈষম্য ও হয়রানির আশঙ্কায় অনেক বন্দি নিজেদের এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার তথ্য গোপন করেন। আবার শুধু শারীরিক লক্ষণ দেখেও এইচআইভি শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ফলে আক্রান্তদের সবাইকে দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা চ্যালেঞ্জের। কোনো আক্রান্ত বন্দি জামিনে বা সাজা শেষে মুক্তি পেলে তার চিকিৎসা যাতে বন্ধ না হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জানানো হয় এবং চিকিৎসা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করা হয়।’










