সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, তার পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের শপথকক্ষে গতকাল বিকালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার নিজেই এ তথ্য জানান।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার বিকাল ৫টা ১ মিনিটে তার স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে দাখিল করেন। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। একই সঙ্গে পদত্যাগপত্রটি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ডে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’
এদিকে পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন লেখেন, ‘আমি মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করি এবং অদ্যাবধি নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়। সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করি। অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে।’
সাহাবুদ্দিন আরো লেখেন, ‘নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়ে সরকার পরিচালনা করছে। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।’

নিজের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগগুলোর প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসমর্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন। এমতাবস্থায় সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করছি।’
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সে দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপ্রধান বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।
দেশের ২২তম রাষ্ট্রপ্রধান মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদের পৌনে দুই বছর বাকি থাকতেই দায়িত্ব থেকে ইস্তফা নিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন সাহাবুদ্দিন। এক সময় তিনি ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার।
দায়িত্ব নেয়ার ১৬ মাসের মাথায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে। হাসিনা আমলের কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। তিনিই সংসদ বিলুপ্তির আদেশ দেন এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়ান। অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে সই দেয়ার আনুষ্ঠানিকতাও সারেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নতুন সরকারের শপথ পড়ান মো. সাহাবুদ্দিন। ফলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পটভূমিতে ভিন্নতা তৈরি হয়। মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলটির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও সরকার গঠনের পর বিএনপি তাকে সঙ্গে সঙ্গে সরানোর পথে যায়নি। সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল। তবে সরকার বা বিএনপি প্রকাশ্যে কখনো তার পদত্যাগ দাবি করেনি।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে গত মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়ে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা শুরু হয়।
এর আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য গত মে মাসে লন্ডনে ঘুরে আসেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও তার সঙ্গে ছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিঙ্গাপুরে তার কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শে সে অস্ত্রোপচারের ফলোআপ পরীক্ষা করাতেই তিনি যুক্তরাজ্যে যান। ১২ মে কেমব্রিজের রয়াল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির এনজিওগ্রাম করা হয়। সে সময় হৃদযন্ত্রের একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে এনজিওপ্লাস্টি করে একটি স্টেন্ট বসানো হয়। এরপর তাকে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। নয় দিন পর দেশে ফেরেন রাষ্ট্রপতি। তখন বঙ্গভবনের প্রেস বিভাগ ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের বরাতে তার শারীরিক অবস্থা ‘স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক’ বলে জানিয়েছিল।
যুক্তরাজ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সারসংক্ষেপ ও নথিতে ডিজিটালি অনুমোদন দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। লন্ডনে সুদানের প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিসের সঙ্গে তার অনানুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎও হয়।
কয়েকদিন ধরে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। রাষ্ট্রপতি লন্ডনে গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন বলে প্রকাশিত খবরের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, এ বিষয়ে তাদের কিছু জানা নেই।
এর মধ্যেই ওইদিন বিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, থাইল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার দেশে ফিরছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই তিনি ব্যাংককে গিয়েছিলেন। সফরসূচি অনুযায়ী আগামী রোববার তার ফেরার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের দুইদিন আগে গতকাল দুপুরে দেশে ফেরেন। বিকালে সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কথা জানান স্পিকার।
সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে দলটির মনোনীত ব্যক্তিরই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে, তা নিয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে কয়েক দিন ধরে আলোচনা চলছে।










