প্রায় এক দশক ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসায় বাংলাদেশ মাদক পাচার, মানবপাচার এবং অবৈধ অস্ত্র প্রবাহসহ বিভিন্ন ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধের শিকার হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। একই সঙ্গে তিনি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত ৩৩তম আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের (এআরএফ) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দিতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন বলে বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
বৈঠকে ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সংলাপ, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বর্তমানে নজিরবিহীন ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উদ্ভূত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় টেকসই সংলাপ ও কূটনীতিই সবচেয়ে কার্যকর পথ। তিনি সামুদ্রিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সব রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষ করে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন (ইউএনক্লস) মেনে চলা এবং শান্তিপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্যের সমাধানের আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় বাংলাদেশ মাদক পাচার, মানবপাচার এবং অবৈধ অস্ত্র প্রবাহের মতো বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত অপরাধের শিকার হয়েছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা পরিস্থিতির কারণে রাষ্ট্রহীন নয়, বরং পরিকল্পিতভাবেই রাষ্ট্রহীন। এটি একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা, যার সমাধানও হতে হবে রাজনৈতিক। তিনি এআরএফভুক্ত দেশগুলোর প্রতি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির প্রচেষ্টায় সম্মিলিতভাবে সহযোগিতার আহ্বান জানান।
জলবায়ুজনিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রস্তুতি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দুর্যোগ ত্রাণবিষয়ক এআরএফ আন্তঃসেশনাল বৈঠকের সহসভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ এআরএফ কাঠামোর আওতায় আঞ্চলিক সক্ষমতা আরও জোরদারের পক্ষে কাজ চালিয়ে যাবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উদীয়মান প্রযুক্তির সম্ভাবনা এবং ঝুঁকির বিষয়ও তুলে ধরেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি সাইবার নিরাপত্তা হুমকি, বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার এবং উন্নত প্রযুক্তির অপব্যবহার মোকাবেলায় আরো ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান জানান। পাশাপাশি অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ও উন্নয়ন বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটবে এমন একটি আঞ্চলিক প্রযুক্তি পরিচালনা কাঠামো অনুসন্ধানের প্রস্তাব দেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির ভিত্তিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশের অটল সমর্থনের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সবসময় বিভাজনের পরিবর্তে সংলাপ এবং মেরুকরণের পরিবর্তে অংশীদারত্বের পথই বেছে নেবে।










