কর্তব্য পালনে ছুটে যান দুর্ঘটনাস্থলে। তবে নিজের পরিবারের সঙ্গে থাকার সুযোগ মেলে না সহজে। শুধু তিনিই নন; আবাসন সুবিধার সংকটে দেশের সাড়ে নয় হাজার ফায়ার সার্ভিস বা অগ্নিনির্বাপণকর্মীর অনেককেই পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়। পরিবার নিয়ে বসবাসের সুযোগ না থাকায় অনেকটা বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের। দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকায় বিষণ্নতা ও মানসিক চাপে ভুগছেন অনেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের জন্য মানসম্মত আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে তাদের কর্মস্পৃহা, মনোবল ও সেবার মানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে নয় হাজার অগ্নিনির্বাপণকর্মী কর্মরত। তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা। কর্মকর্তা পর্যায়ে সীমিত পরিসরে আবাসন সুবিধা থাকলেও অনেক ভবন জরাজীর্ণ ও বসবাসের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত নয়। রাজধানীর তেজগাঁও ফায়ার স্টেশনের পাশে একটি আবাসিক কোয়ার্টার থাকলেও ভবনটি বর্তমানে ব্যবহার অনুপযোগী। সদরঘাট এলাকায় একটি জরাজীর্ণ স্থাপনায় অস্থায়ী কোয়ার্টার করা হয়েছিল। তবে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলায় সেটিও এখন ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
আবাসনের অভাবে অধিকাংশ অগ্নিনির্বাপণকর্মীকে ফায়ার স্টেশনেই অবস্থান করতে হয়। স্টেশনের ডরমিটরিতে অল্প জায়গায় অনেককে একসঙ্গে থাকতে হওয়ায় তারা বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। শহরাঞ্চলে বাসা ভাড়া করে পরিবার নিয়ে থাকা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। তাই তাদের নিয়মিত ছুটি নিয়ে বাড়ি যেতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন এ জরুরি সেবাকর্মীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে তৈরি হচ্ছে টানাপড়েন, তেমনি কর্মক্ষেত্রেও পড়ছে এর প্রভাব।
ফায়ার সার্ভিস তেজগাঁও স্টেশনের একজন ফায়ার ফাইটার জানান, দিনের পর দিন পরিবার থেকে দূরে অবস্থান করায় সন্তানদের বেড়ে ওঠা, পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজন কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। মানসিক চাপও বাড়ে। পাশাপাশি ঘন ঘন ছুটি নিতে হয়। আবাসন ব্যবস্থা থাকলে এমন পরিস্থিতি হতো না।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক উপপরিচালক (অপারেশন) দেবাশীষ বর্ধন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে রাজধানীসহ সারা দেশের বহু স্থাপনা মারাত্মক অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সার্বিক সামর্থ্য বাড়ানো জরুরি। সারা দেশের স্টেশনগুলোয় এখনো পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম দিতে পারেনি সংস্থাটি; প্রত্যাশিত বিশ্বমানের প্রশিক্ষণও পাননি অধিকাংশ কর্মী। উদ্ধারকাজ করতে গিয়ে অনেকের মৃত্যুও হয়েছে। এমন বাস্তবতায় সারা দেশের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যকর আবাসন ব্যবস্থাও নির্মাণ করতে হবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের আবাসন ও কল্যাণ নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ দুর্যোগ মোকাবেলার প্রথম সারির এ সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে দেশের জরুরি সেবা ব্যবস্থাও আরো শক্তিশালী হবে।
ফায়ার স্টেশনে অল্প জায়গায় অনেক কর্মী থাকার কারণে তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারেন বলে জানান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকলে স্ক্যাবিস ও ইউরিনারি ইনফেকশনের মতো রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি থাকে। একজন ব্যক্তি যেখানেই চাকরি করুক না কেন, তার কর্মস্থলের পাশাপাশি বসবাসের জায়গাটিও স্বাস্থ্যকর হওয়া জরুরি। যখন একজন কর্মী শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ থাকবেন না, তখন তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কমে যাবে। তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।’
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের আবাসন সমস্যা সমাধানে ঢাকার মিরপুর ও সদরঘাট এলাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দুটি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। পাশাপাশি মিরপুরে সংস্থার নতুন সদর দপ্তর ভবন নির্মাণের কাজও চলমান। বাহিনীর সদস্যদের জন্য ‘ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ ভাতা’ ও ‘ফ্রেশ মানি’ চালুর বিষয়টি সরকার পর্যালোচনা করছে। এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানা গেছে।
আবাসন সংকট নিরসনে নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসে দীর্ঘদিন ধরে আবাসন সমস্যা বিদ্যমান। এ সংকট মোকাবেলায় ঢাকার মিরপুর ও সদরঘাটে দুটি ১২ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যেখানে ৮৮টি পরিবারের আবাসনের ব্যবস্থা হবে। এছাড়া পর্যায়ক্রমে বিভাগভিত্তিক আবাসিক ভবন নির্মাণ এবং পদায়ন নীতিমালায় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে সদস্যরা তুলনামূলকভাবে পরিবারের কাছাকাছি অবস্থান করতে পারেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেও বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব হাসপাতালের জন্য আংশিক জনবল অনুমোদন পাওয়া গেছে। প্রয়োজনীয় নিয়োগ সম্পন্ন হলে হাসপাতালটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে নিয়মিত উদ্বুদ্ধকরণ সেশন পরিচালনা করা হচ্ছে। সদস্যদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।










