গত কয়েক দশকে দেশে উচ্চ শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েটের জন্য সে অনুপাতে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বছরে ২০ লাখের বেশি তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশের উপযোগী হলেও কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারছেন মাত্র সাত-আট লাখ। তাদেরও প্রায় ৮৪ শতাংশ কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। ফলে ডিগ্রিধারী তরুণের সংখ্যা বাড়লেও যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বর্তমানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা প্রায় ৯ লাখ ৪৩ হাজার তরুণ বেকার, যা মোট বেকারের প্রায় ৩৬ শতাংশ। আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও কর্মসংস্থানের অভাবে উচ্চশিক্ষিত এ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ উল্টো অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। চাকরি বাজারের চাহিদার তুলনায় গ্র্যাজুয়েটের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার এ পরিস্থিতিই অর্থনীতিতে ‘গ্র্যাজুয়েট গ্লাট’ বা ডিগ্রিধারী জনশক্তির আধিক্য হিসেবে পরিচিত।

প্রতি বছর শ্রমশক্তি জরিপ প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটির সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে তরুণ জনসংখ্যা ১২ কোটি ১৭ লাখ। এর মধ্যে যুব শ্রমশক্তির আকার ২ কোটি ২৬ লাখ। এ শ্রমশক্তির মধ্যে বেকার রয়েছেন ২৬ লাখ ২০ হাজার তরুণ। তাদের মধ্যে পুরুষ ১৮ লাখ ও নারী ৮ লাখ ২০ হাজার।

কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আকার বড় হলেও তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বাইরে রয়ে গেছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কর্মক্ষম বয়সী। তবে আগামী কয়েক দশকে এ জনমিতিক কাঠামোয় দ্রুত পরিবর্তন আসবে।

জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন হাইলাইটস ২০২৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা কমে ৩ কোটি ১০ লাখে নেমে আসবে। একই সময়ে মোট জনসংখ্যায় তরুণদের অংশ ১৮ দশমিক ৯ থেকে কমে ১৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়াবে। বিপরীতে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের অংশ বেড়ে হবে ১৩ শতাংশ। প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

এ প্রেক্ষাপটে আজ সারা দেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় যুব দিবস। প্রতি বছর ১ নভেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দিবসটি পালন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’। তবে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া হলেও বাস্তবে দেশের তরুণদের বড় একটি অংশ এখনো প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতিতে রয়েছে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও অনেকেই সেই শিক্ষা কর্মক্ষেত্রে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারছেন না।

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব নিয়ে সম্প্রতি উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির ‘গ্র্যাজুয়েটিং ইনটু আনসার্টেনটি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৩৬ জনই বেকার। এ হার সামগ্রিক তরুণ বেকারত্বের হারের সাড়ে তিন গুণেরও বেশি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় উচ্চ। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৮ শতাংশ, ভিয়েতনামে ১৬, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে ১৩, ফিলিপাইনে ১২ ও সিঙ্গাপুরে ৮ শতাংশ। তবে ভারতে এ হার বাংলাদেশের চেয়েও বেশি, প্রায় ৪২ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা বিবিএসসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রকাশিত পরিসংখ্যানের তুলনায় অনেক বেশি। সরকারি-বেসরকারি হিসাবে বেকারত্বের হার ৪-৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও বাস্তবে এর পরিধি আরো বিস্তৃত। তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্ব। একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় ও সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় অনেক গ্র্যাজুয়েট এসব কাজে যুক্ত হতে আগ্রহী নন, অন্যদিকে তাদের জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না।

এর সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে না পারায় শ্রমবাজারে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো সংকুচিত হচ্ছে। ফলে দক্ষতার ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির স্বল্পতা, অনানুষ্ঠানিক খাতের আধিক্য ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন—সব মিলিয়ে বেকারত্ব এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ কর্মক্ষম বয়সী হলেও প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানে যুক্ত রয়েছে মাত্র ১৪-১৫ শতাংশ মানুষ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ কৃষিসহ বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যুক্ত হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষিসহ আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত মানুষের প্রায় ৯৪ শতাংশের দক্ষতা তুলনামূলকভাবে কম। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ কৃষিতে, ১৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ শিল্পে ও ৩৯ শতাংশ সেবা খাতে যুক্ত। ফলে শ্রমবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক ও উচ্চ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ার পেছনে দক্ষতার ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শিক্ষাক্রমের সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সামঞ্জস্য না থাকায় প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না। কারিগরি ও খাতভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে জোর দেয়া গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং বেকারত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ থাকলেও তা এখনো চাহিদার তুলনায় সীমিত। বিশেষ করে সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ বাড়লেও পদের সংখ্যা সীমিত থাকায় চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন চাকরির পোর্টালের তথ্যের ভিত্তিতে শ্রমবাজারের চাহিদা-জোগানের অবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ধাক্কার প্রভাব’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে অনলাইন চাকরির প্লাটফর্মে একটি পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জনের বেশি প্রার্থী আবেদন করছেন। কভিড-১৯ মহামারীর আগের পাঁচ বছরে একই ধরনের চাকরিতে গড়ে আবেদন করতেন ১৭৩ জন। সে হিসাবে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ, যা কর্মসংস্থানের সংকটকে আরো প্রকট করে তুলেছে।

উচ্চশিক্ষিত বেকারের বড় এ জনগোষ্ঠী অর্থনীতিতে কী ধরনের চাপ তৈরি করছে জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক এটিকে ‘মিসঅ্যালোকেশন অব রিসোর্স’ বা সম্পদের অদক্ষ বণ্টন হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষার গুণগত মানের ঘাটতি এ সমস্যার প্রধান কারণ।

এ অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের উচ্চ শিক্ষার পেছনে সরকার যে বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করছে সেটি সম্পদের অযাচিত বণ্টন। যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে তার আউটপুট দেখা যাচ্ছে না। কারণ কাঠামোগত সমস্যা, প্রতি বছর দেশে যে পরিমাণ গ্র্যাজুয়েট উচ্চ শিক্ষা শেষ করে বের হচ্ছেন সে পরিমাণ চাহিদা সব প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে নেই। শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি তৈরি করা যাচ্ছে না। ফলে আমরা সম্পদ খরচ করছি, কিন্তু তার প্রতিফলন নেই। এটি অর্থনীতির জন্য বড় চাপ। আরেকটি বিষয় সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট। দেশে কারিগরি, কেয়ার গিভার, ডিপ্লোমা, আইটি খাতের দক্ষ জনবল দরকার, সেখানে উচ্চশিক্ষিতরা যেতে চান না। আরেকটি বড় চাপ হচ্ছে শিক্ষার গুণগত মানের অভাব। শিক্ষা ব্যবস্থায় যেসব বিষয়ে ডিগ্রি দেয়া হচ্ছে সেগুলো চাকরি বাজারের জন্য উপযোগী নয়। ফলে বেকারত্ব বিরাট আকার ধারণ করছে, যার সামগ্রিক প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়ছে।’

দেশে আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা করছে সরকার। শিক্ষিত ও অশিক্ষিত—দুই শ্রেণীর বেকারদের জন্যই কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান।

তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য আমরা মূলত দুই ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছি। একটি হলো শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ, অন্যটি আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে এমন প্রশিক্ষণ। বর্তমানে দুই ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমই চালু রয়েছে। পাশাপাশি এগুলো আরো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইএআরএন প্রকল্পের আওতায় তিন বছরে আট লাখ যুবককে আইটি প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এআই-সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ পাবে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ জন। এটি অ্যাডভান্সড প্রশিক্ষণ, যার মাধ্যমে তারা এআইয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে টিকে থাকতে পারবে। এছাড়া বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এতে অন্যদেরও কর্মসংস্থান তৈরি হবে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ছাড়াও আরো অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। সবাই যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করছে। সব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারের বৃহত্তর কর্মসংস্থান পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে।’