অনেক জায়গায় হিটস্ট্রোকে পোলট্রি মুরগি ও বাচ্চা মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ক্ষতি কমাতে খামারিরা জেনারেটর ব্যবহার করলেও তাতে আবার বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। তারা বলছেন, তীব্র গরমের কারণে মুরগির খাদ্যগ্রহণ কমে গেছে। এর প্রভাবে ডিম ও বাচ্চা উৎপাদন কমে গেছে। এছাড়া মুরগির বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে একই ধরনের সংকটে পড়েছেন গরু-দুগ্ধ ও মৎস্য খামারিরাও।
বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে একদিকে উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়বে, অন্যদিকে কমবে মাংস ও ডিম উৎপাদন। এমনটাই বলছেন খামারিরা। এর প্রভাব পড়তে পারে বাজারেও।
খামারিরা জানিয়েছেন, লেয়ার ও ব্রিডার খামারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ চলে গেলে খামারের ভেন্টিলেশন, কুলিং সিস্টেম ও আলোর ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। ফলে অতিরিক্ত গরমে মুরগির খাদ্যগ্রহণ কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ডিম ও বাচ্চা উৎপাদনে। এছাড়া হিটস্ট্রোকে অনেক মুরগি মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে যাদের খামারে বড় গরু আছে, তারাও আছেন দুশ্চিন্তায়। কারণ বড় গরুর হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মেহেরপুর সদর উপজেলার গোপালনগরের মেসার্স এআর এগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী মো. হাবিবুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে লেয়ার মুরগি বাঁচাতে বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। তীব্র গরমে মুরগি মারা যাচ্ছে, ডিম উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং বাচ্চা উৎপাদনও আগের মতো হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।’
পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘জেলায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি মিলিয়ে ৫৫ হাজারের বেশি নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত খামার রয়েছে। বিদ্যুতের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা থাকলে খামারগুলোর উৎপাদন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।’
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের ডিম উৎপাদনকারী আলম মণ্ডলের ১০টি খামারে ৩০ হাজারের মতো মুরগি রয়েছে। হিটস্ট্রোক থেকে মুরগিকে বাঁচাতে প্রতিদিন ২০ কেজি স্যালাইন খাওয়ানো হচ্ছে। এছাড়া জেনারেটর চালানোর কারণে প্রতিদিন তার অতিরিক্ত ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর পরও প্রতিদিন মুরগি মারা যাচ্ছে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে আমার প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা করে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এর পরও প্রতিদিন পাঁচ-সাতটা করে ডিম দেয়া মুরগি মারা যাচ্ছে। মুরগি খাবার কম খাচ্ছে। আগে যদি ১০০ খাঁচি ডিম পেতাম, এখন ১০-১৫ খাঁচি কম পাচ্ছি। অন্যদিকে খামারে ব্যয় বেড়েছে। দুভাবেই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’
লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছেন চট্টগ্রামের খামারিরাও। ২০২৪-এর ভয়াবহ বন্যার ক্ষতি থেকে এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি জেলার মিরসরাইয়ের ক্ষতিগ্রস্ত ডেইরি ও পোলট্রি খামারিরা। সে সময় অনেক খামারি পুঁজি হারিয়ে খামার গুটিয়ে নিয়েছিলেন। স্বল্প পুঁজি নিয়ে যারা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তারা এবার লোডশেডিংয়ে ঝুঁকিতে পড়েছেন। এরই মধ্যে গরমে অনেক খামারির মুরগি মারাও গেছে।
মিরসরাই উপজেলা পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও বাপ্পি পোলট্রি ফার্মের স্বত্বাধিকারী জাহেদ হোসেন বাপ্পি বলেন, ‘মিরসরাই ও ছাগলনাইয়ায় আমার ১৫টি খামার রয়েছে। সেখানে প্রায় ৫০ হাজার ব্রয়লার ও সোনালি মুরগি আছে। লোডশেডিংয়ের কারণে এ পর্যন্ত খামারের পাঁচ-আট হাজার মুরগি মারা গিয়েছে। যেগুলো বেঁচে আছে গরমের কারণে সেই মুরগির ওজনও বাড়ছে না। এমন চললে আবারো আমরা লোকসানে পড়ব।’
মিরসরাই উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শুভ সূত্রধর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে মুরগির হিটস্ট্রোক হতে পারে। আমি গত মঙ্গলবার এখানে যোগদান করেছি। যোগদানের পর এখন পর্যন্ত কোনো খামারে মুরগি মারা গিয়েছে এমন তথ্য পাইনি।’
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার সাজাইল গ্রামের বাংলা অ্যাগ্রো পোলট্রি ফার্মের স্বত্বাধিকারী মো. আকিবুল ইসলাম বলেন, ‘খামারে আড়াই হাজারের মতো ব্রয়লার আছে। জেনারেটর চালিয়ে মুরগিকে হিটস্ট্রোক থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি। তার পরও কিছু মুরগি মারা গিয়েছে। জেনারেটর চালানোর ফলে প্রতি কেজি ব্রয়লার উৎপাদনে ১৩০-১৪৫ টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ১৪০ টাকায়।’
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বরমপাল্টা গ্রামের লেয়ার খামারি সুরেশ ভদ্র বলেন, ‘গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে ডিম উৎপাদন ১০-২০ ভাগ কমেছে। এক হাজার মুরগির পেছনে প্রতিদিন গড়ে ৭ হাজার টাকা খরচ করছি। কিন্তু ডিম পাচ্ছি ৮০০-৯০০। উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. গেবিন্দ চন্দ্র সরদার বলেন, ‘গরম ও লোডশেডিংয়ে জেলার পোলট্রি ফার্মগুলোয় ১০ শতাংশ মড়ক দেখা দিয়েছে। ডিম উৎপাদন ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।’
লোডশেডিং ও গরমে মুরগিকে অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা স্থানে রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘মুরগিকে পর্যাপ্ত স্যালাইন ও পানি পান করাতে হবে। খাবারের বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই পোলট্রি সুরক্ষিত থাকবে।’
শুধু পোলট্রিই নয়, লোডশেডিংয়ের কারণে বিপাকে পড়েছেন মাছচাষী ও গবাদিপশুর খামারিরাও। পুকুরে মাছের ঘনত্ব বেশি হলে এয়ারেটর (বাতাস সঞ্চালক যন্ত্র) ব্যবহার করতে হয়। যন্ত্রটি বাতাসকে পানির সঙ্গে মিশিয়ে তাপমাত্রা কমায় এবং ক্ষতিকর গ্যাস বের করে দেয়। ফলে পানিতে অক্সিজেন লেবেল ঠিক থাকে। গ্রামে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো এয়ারেটর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এতে গরমে মাছ মরে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন মৎস্যচাষীরা।
ঝিনাইদহের মৎস্য খামারি কবির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুকুরে দুই-তিন কেজি ওজনের মাছ রয়েছে। পানি গরম হয়ে যাচ্ছে। রাতে ঠিকমতো এয়ারেটর চালাতে পারি না। যে গরম আর লোডশেডিং, মাছ নিয়ে ভয়ে আছি।’
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, গত দুদিনে দেশে লোডশেডিং কিছুটা কমেছে। মঙ্গলবার দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা পিক আওয়ারে (সন্ধ্যায়) ছিল ১৬ হাজার ১৭১ মেগাওয়াট। বিপরীতে ৫৪৯ মেগাওয়াট পরিমাণ লোডশেডিং করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে ময়মনসিংহ জোনে। এছাড়া কুমিল্লা জোনে ৯৬, ঢাকায় ৭৭, খুলনায় ৫১, সিলেটে ১৪ ও বরিশালে তিন মেগাওয়াট লোডশেডিং দেয়া হয়েছে। তবে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে জোনে লোডশেডিং ছিল না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৭ জুন পিক আওয়ারে (সন্ধ্যায়) বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৬২৫ মেগাওয়াট। বিপিডিবির বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদনচিত্র থেকে দেখা গেছে, ওইদিন ১৫ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। সেই হিসাবে লোডশেডিং ১ হাজার ৯৭৫ মেগাওয়াট। তবে বিদ্যুতের সঞ্চালন সংস্থা পাওয়া গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, গত ২৭ জুন সারা দেশে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮৭৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ঢাকা বিভাগে, মোট ৫৩৮ মেগাওয়াট। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ময়মনসিংহে। ওই বিভাগে মোট ৫১৯ মেগাওয়াট, এরপর খুলনায় ৩৭৫, রাজশাহীতে ৩৫২, কুমিল্লায় ৩৪৩, বরিশালে ১৪২, চট্টগ্রামে ১৬২ ও রংপুরে ১৯৬ মেগাওয়াট।
দেশে বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি এবং বিদ্যুতের কিছুটা উৎপাদন বাড়ায় আপাতত লোডশেডিং কমে এসেছে। তবে তাপদাহ বাড়লে এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো না গেলে সামনে আবারো লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহে লোডশেডিং কম দেখা গেলেও বিদ্যুতের বিতরণ পর্যায়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানিগুলোকে। বিশেষ করে চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের সময় বাড়তি বিদ্যুতের লোড বরাদ্দের কথা এরই মধ্যে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসিকে জানিয়েছে পল্লী বিদ্যুতের অনেক সংস্থা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ণবয়স্ক পোলট্রি তথা ব্রয়লার মুরগির জন্য ৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত (প্রায় ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রাকে নিরাপদ ধরা হয়। এর বেশি হলে মুরগি অস্বস্তিতে ভোগে। সেজন্য তাকে ঠাণ্ডা পরিবেশ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। তারা বলছেন, এ তীব্র গরমের কারণে মুরগির খাদ্যগ্রহণ কমে যাওয়ায় এর বৃদ্ধি কমে যাবে। আবার হিটস্ট্রোকে মারাও যেতে পারে। এজন্য ঘরকে ঠাণ্ডা রাখা ও ব্রয়লারের খাদ্যশৃঙ্খলে পরিবর্তন আনতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্রয়লার মুরগি বেশি গরম সহ্য করতে পারে না। এখন যেমন গরম, সেখানে তাদের টিকে থাকাটাই কঠিন। সেজন্য হিটস্ট্রোক থেকে মুরগিকে বাঁচাতে ঘর ঠাণ্ডা রাখতে হবে। প্রয়োজনে ঘরের চালে কিছুক্ষণ পর পর পানি ছিটানো কিংবা পাটের চট দিয়ে ঢেকে রাখা যেতে পারে। এতে ঘর গরম হবে কম। এছাড়া মুরগির খাবারের পানির সঙ্গে লেবুর রস ও গ্লুকোজ মিশিয়ে দেয়া যেতে পারে।’
সার্বিক বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে পোলট্রি খামারে প্রভাব পড়তে পারে। এ বিষয়ে আমরা আগেই বিদ্যুৎ বিভাগে চিঠি দিয়েছি। খামারিদের সচেতন করতে মাঠপর্যায়ের আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করছেন। সতর্কতামূলক লিফলেট বিতরণ করছি। পোলট্রি খামারের চালায় পানি ঢালা, চট দিয়ে ঢেকে দেয়া, ঘরগুলো খোলামেলা রাখার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’










