এর মধ্যে শুধু মে মাসে বাস্তবায়নের হার মাত্র ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। বিপুল বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নে পিছিয়ে রয়েছে স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) কর্তৃক গতকাল প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
আইএমইডির তথ্য অনুসারে, চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৩৫৯টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটে তা কমে ২ লাখ কোটি টাকায় নেমে আসে। তবে প্রতি বছর উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়লেও ধারাবাহিকভাবে কয়েক বছর ধরে কমছে এডিপি বাস্তবায়নের হার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৭৬৯ কোটি টাকা। টাকার অংক ও বাস্তবায়নের হার উভয় দিক বিবেচনা করলেও গত ছয় অর্থবছরের একই সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন; শুধু বাস্তবায়নের হারে যা ১৬ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম। এ সময়ে প্রতি বছর গড়ে ৬৫-৭০ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়। এবার তা ৫০ শতাংশের কম হলো। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ৪৯ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, ২০২৩-২৪-এ ৫৭ দশমিক ৫৪, ২০২২-২৩-এ ৬১ দশমিক ৭৩ ও ২০২১-২২ অর্থবছরের এ সময়ে ছিল ৬৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
চলতি বছর এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাণিজ্য, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগ—স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ যথাক্রমে ২৫ দশমিক ৮৯ ও ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০ দশমিক ৪৫ শতাংশ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৭ দশমিক ৮৭ ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ১২ দশমিক ২৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি বাস্তবায়ন করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয়টি এ ১১ মাসে ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৮২ দশমিক ৫৩ শতাংশ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ৭৯ দশমিক ৪৮, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৭২ দশমিক ৫০ ও খাদ্য মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করেছে ৬৮ দশমিক ৪১ শতাংশ।
বিপুল পরিমাণ বরাদ্দের পরও ব্যয় করতে না পারার পেছনে কর্মকর্তাদের সক্ষমতার অভাবকে দায়ী করছেন আইএমইডির কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদরা। আইএমইডির শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এ দেশে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান প্রতিবন্ধকতা কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও কাজের প্রতি উদাসীনতা। আমরা প্রতি মাসে একটা অ্যালার্ম দিই যে কোন মন্ত্রণালয়ের কী অবস্থা। সেখানে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাস্তবায়নকারী সংস্থার সমন্বয়হীনতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মতো বিষয়গুলো জানানো হয়। তার পরও তাদের নজরদারির অভাবে বাস্তবায়নে শ্লথগতিই থাকছে। গত কয়েক বছর এটি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।’
প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাবের পাশাপাশি তিনটি বিষয় দায়ী বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘চলতি বছর প্রকল্প বাস্তবায়নের এমন শ্লথগতির প্রথম কারণ অন্তর্বর্তী সরকার এডিপি কাটছাঁট করেছে এবং অনেক প্রকল্পে অর্থায়ন করেনি। দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক ঋণ বা সহায়তার অর্থছাড় করতে না পারা এবং বিদেশী সাহায্য কমে যাওয়া। গত বছর বিদেশী সাহায্য ২৫ শতাংশ কমেছিল, এ বছর আরো কমবে। এছাড়া ঐতিহাসিকভাবে আমাদের সক্ষমতার অভাব তো আছেই।’
ভবিষ্যতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে বলে জানান জোনায়েদ সাকি। সম্প্রতি নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘এখন থেকে প্রকল্পে যে বিনিয়োগ হচ্ছে, সেখান থেকে কী আয় আসবে, ফেরত আসবে, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট কী হবে, সে জায়গাটাও গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হচ্ছে। দফায় দফায় ব্যয় ও টাকা বাড়ানো, দেরি করা—এসব বিষয় আমরা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি।’










