সামাজিক ব্যবসাকে প্রচলিত অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে একটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ আখ্যা দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেছেন, মুনাফা অর্জন এবং সমাজকল্যাণের মধ্যকার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বই এ মডেলকে যুগান্তকারী এবং টেকসই করার ক্ষেত্রে একটি বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। গতকাল বুধবার ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে (এনএসইউ) আয়োজিত এক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ড. মঈন খান বলেন, সামাজিক ব্যবসা শব্দবন্ধটি কি নিজের মধ্যেই একটি বৈপরীত্য নয়? এখানে ‘সামাজিক’ ও ‘ব্যবসা’—দুটি শব্দ রয়েছে, যা একে-অপরের বিপরীত। যখন আপনি সামাজিকতার কথা বলেন, তা সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর যখন ব্যবসার কথা বলেন, তা ব্যক্তিগত মুনাফা লাভ এবং প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির টিকে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত।

প্রচলিত ব্যবসার উদাহরণস্বরূপ ইলন মাস্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেখানে সম্পদ পুঞ্জীভূত হয় নিজের লাভের জন্য, সমাজের মানুষের জন্য নয়। প্রচলিত অর্থনৈতিক মডেলটি মূলত দরিদ্রদের সেবা করার চেয়ে তাদের শোষণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, সামাজিক ব্যবসা এ ধারণার পুরোপুরি বিপরীত। তার মতে সামাজিক ব্যবসা হলো শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা সর্বোচ্চ করার পরিবর্তে এর লক্ষ্য লভ্যাংশ বন্ধ করে উদ্বৃত্ত অর্থ আবার সম্প্রদায়ের কল্যাণে বিনিয়োগ করা।

গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট পুষ্টি উদ্যোগের (যেমন, কম আয়ের পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী দই প্রকল্প) উদাহরণ দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন, এ মডেল বাস্তবে রূপ দেয়া সম্ভব। মুনাফা ছাড়া ব্যবসা করা সত্যিই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে পৃথিবীর সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বার্থে এ চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করা অত্যন্ত মূল্যবান।

এ সময় সামাজিক ব্যবসার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অবদানকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন ড. মঈন খান। গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি থেকেই এ ধারণার উৎপত্তি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শিক্ষকতার প্রতি গভীর অনুরাগ প্রকাশ করে ড. মঈন খান বলেন, মানসিকভাবে আমি একজন শিক্ষক। কোনোভাবে পরিস্থিতির কারণে রাজনীতিতে আসতে বাধ্য হয়েছি। যদি জ্ঞান অর্জন করতে চাও, তবে প্রশ্ন করো। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়তে এসেছ, তখন প্রশ্ন করার মানসিকতা নিয়ে তৈরি থেকো।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করে ড. মঈন খান বলেন, তৎকালীন সরকারি বাহিনীর গুলি ও হত্যাকাণ্ডের মুখে একপর্যায়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা থমকে গিয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকরা রাজপথে এগিয়ে এসেছিলেন।

তিনি আরো বলেন, ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীরা যে নাগরিক সাহসের পরিচয় দিয়েছে, তার সঙ্গে সামাজিক ব্যবসার উদ্যোক্তাসুলভ মানসিকতার একটি যোগসূত্র রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আগামীতেও এমন মেধাবী প্রতিভার বিকাশ অব্যাহত থাকবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সম্মেলনে শিক্ষাবিদ, উদ্যোক্তা এবং সামাজিক ব্যবসার সমর্থকরা উপস্থিত ছিলেন। তারা বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং উন্নয়নমূলক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সামাজিক ব্যবসার ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।