সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে পদায়ন নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। এ পরিস্থিতিতে বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে লটারি পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে সরকার। অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে প্রথম এ পদ্ধতি চালু করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। পরে একই পথে হাঁটে আইন মন্ত্রণালয়। এবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলির ক্ষেত্রেও লটারি পদ্ধতি চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় প্রশাসনিক প্রয়োজন, জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বদলি ও পদায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে এ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্ধারিত যোগ্যদের তালিকা থেকে প্রকাশ্যে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হলে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, তদবির ও বদলি বাণিজ্যের সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের উপযুক্ত স্থানে পদায়নের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ পদ্ধতি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে কারা লটারিতে অংশ নিতে পারবেন এবং প্রশাসনিক প্রয়োজন, জনবল সংকট ও বিশেষ পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো কীভাবে বিবেচনায় নেয়া হবে, তার ওপর।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরে গত ৩০ জুলাই প্রথম দফায় ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়। দ্বিতীয় দফায় ৩ আগস্ট একই পদ্ধতিতে বদলি করা হয় আরো ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে। এরপর ১৬ আগস্ট তৃতীয় দফায় ৪০৯ জন সহকারী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর বদলি হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন ১৫২ জন সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ৬৭ জন সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম), ১৩৫ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) ও ৫৫ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম)। সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর লটারির মাধ্যমে আরো ১৫৫ জন নির্বাহী প্রকৌশলীর বদলি ও পদায়ন হয়। তাদের মধ্যে ১১৬ জন সিভিল এবং ৩৯ জন ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল বিভাগের। সব মিলিয়ে চার দফায় ১ হাজার ৫৮৫ জন প্রকৌশলীর বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও অনিয়মের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তদবির ও প্রভাবমুক্ত স্বচ্ছ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লটারির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীর বদলি ও পদায়ন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত পরিবেশে লটারির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রে সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয় বলে কিছু মানবিক বিষয়ও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায় থেকে বদলির জন্য তদবির এলেও এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সে সুযোগ বন্ধ করে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে।’

লটারি পদ্ধতি চালুর মধ্য দিয়ে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক, কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থার সূচনা হয়েছে বলে মনে করেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে বদলি ও পদায়নের ফলে প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রকৌশলীদের মধ্যে আস্থা, সমতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায়ও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’

গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পর একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। গত ৬ অক্টোবর ঢাকা জেলার গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোয় পদায়নের জন্য লটারির আয়োজন করা হয়। এতে দেশের ‘এ’ ক্যাটাগরির ১৩১ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্য থেকে ১৮ জনকে বাছাই করা হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে ৩৭২ জন সাব-রেজিস্ট্রার কর্মরত এবং শূন্য রয়েছে প্রায় ১৩৯টি পদ।

প্রাথমিকভাবে ঢাকার ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়নের জন্য লটারির মাধ্যমে এ ১৮ জনকে নির্বাচন করা হয়েছে।

তবে লটারিতে নির্বাচিত হলেই সরাসরি নির্দিষ্ট কোনো সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়ন দেয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কর্মদক্ষতা, কাজের চাপ সামলানোর সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট অফিসের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত কর্মস্থল নির্ধারণ করা হবে। এজন্য নির্বাচিত কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারও নেয়া হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। পদায়নের পর তাদের কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা তদারকির আওতায় রাখার কথাও বলেছেন আইনমন্ত্রী। মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা নয়, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোয় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভাঙাও।

লটারি পদ্ধতি চালুর কারণ ব্যাখ্যা করে গত ৬ অক্টোবর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি-পদায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার পোস্টিংকে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাবলিক পারসেপশনে যেসব এলাকাকে দুর্নীতির আখড়া মনে করা হয়, সেসব স্টেশনের সিন্ডিকেট ভাঙতেই আমরা লটারি পদ্ধতির উদ্যোগ নিয়েছি। এর মাধ্যমে কোনো বৈষম্য ছাড়াই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘শুধু ঢাকা নয়, যেসব জায়গা “‍প্রাইজ পোস্টিং” হিসেবে বিবেচিত এবং যেখানে দুর্নীতির শিকড় গজানোর অভিযোগ রয়েছে, পর্যায়ক্রমে সেসব জায়গার পদায়নেও স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেয়া হবে। প্রাথমিকভাবে ঢাকায় শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে এ পদ্ধতি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে লটারির মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দক্ষতা ও কর্মস্থলের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত পদায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং আইন মন্ত্রণালয়ের পর এবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলিতেও লটারি পদ্ধতি চালুর কথা ভাবছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ২৭ অক্টোবর টাঙ্গাইলে শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব জেলা প্রশাসকদের দেয়া হয়েছে। একই স্থানে একাধিক প্রার্থী থাকলে প্রয়োজনে লটারি করা হবে। বদলিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না।’

তবে এ পদ্ধতি কার্যকর করতে হলে বিদ্যমান বদলি নীতিমালায় সংশোধন আনতে হবে। গত ফেব্রুয়ারিতে সমন্বিত অনলাইন বদলি নির্দেশিকা প্রকাশের পর জুনে নতুন পদ্ধতি চালু করা হয়। এরপর জুলাইয়ে নীতিমালায় সংশোধন আনা হয়েছিল।

সার্বিক বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যেই কাজ চলছে। এরই মধ্যে এ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এর ফলে বদলি-পদায়নে তদবির ও অনিয়মের সুযোগ কমে আসবে।’

বদলি ও পদায়ন দুর্নীতির অন্যতম বড় উৎস, যেখানে তদবির ও অনিয়মের প্রবণতাও বেশি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে লটারি পদ্ধতি একটি কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে বলে মনে করেন সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন করা হলে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগও কমে আসে। তবে লটারি প্রক্রিয়াকে অবশ্যই কারসাজি ও অনিয়মমুক্ত রাখতে হবে। বিশেষ করে কোনো ডিভাইস বা প্রযুক্তি ব্যবহার করে যাতে ফলাফল প্রভাবিত করা না যায়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হলে যার যেখানে পদায়ন হবে, সেখানে দায়িত্ব পালনে যাওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তির সুযোগ থাকার কথা নয়।