এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, ডিজিটাল সেবা, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, উন্নত বস্ত্র শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও লজিস্টিকস খাতে বিশেষ প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, তৈরি পোশাক শিল্পে বৈচিত্র্য আনা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রযুক্তি ও দক্ষতায় গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলেও জানান।

রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই বা ফিকি) আয়োজিত এফডিআই সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সরকারপ্রধান এ কথা বলেন। ‘বাংলাদেশে কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক দিনব্যাপী এ সম্মেলনে দেশ-বিদেশের প্রায় ৬০০ প্রতিনিধি অংশ নেন।

বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী, বহুজাতিক কোম্পানির নির্বাহী কর্মকর্তা, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

আয়োজকদের ভাষ্য, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পরবর্তী ধাপে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে এফডিআই আকর্ষণের উদ্যোগ আরো জোরদার করছে। এ প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কার্যকর সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মূল সম্মেলন শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইনভেস্টরস এক্সপো পরিদর্শন করেন এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য একটি নিয়মভিত্তিক, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত এবং বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে পরিচালিত অর্থনীতি গড়ে তোলা। আমাদের নির্বাচনী ইশতাহারে এ অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা রয়েছে। আমরা শুধু বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছি না, এ রূপকল্প বাস্তবায়নে আমাদের বিশ্বস্ত অংশীদার হওয়ারও আহ্বান জানাচ্ছি।’

বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে সত্যি, পাশাপাশি আমাদের রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা ও সুদৃঢ় ভিত্তি। আমাদের রয়েছে একটি দ্রুত বিকাশমান বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, একঝাঁক তরুণ ও পরিশ্রমী মানবসম্পদ, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং নিরঙ্কুশ জনসমর্থনপুষ্ট একটি নির্বাচিত সরকার। এ শক্তিগুলো একত্র হয়ে বাংলাদেশকে এক টেকসই ও স্থায়ী সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’

বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ব্যবসার সাফল্যের একটি বড় অংশ সরকারের প্রবৃদ্ধি-সহায়ক নীতিমালার ওপর নির্ভর করে। আমরা আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আধুনিকায়ন, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদার, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি, কর ও ভ্যাট প্রশাসন সহজীকরণ এবং মুনাফা দেশে ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া আরো সহজ করছি। একই সঙ্গে পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা, স্টার্টআপে উৎসাহ দেয়া, অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমানো, সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন এবং বন্দর, লজিস্টিকস, জ্বালানি নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

ফিকির সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক নতুন ধাপে প্রবেশ করছে। এ সময়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে, মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থান শক্ত করতে মানসম্পন্ন বিদেশী বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ জোরদার করা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ তুলে ধরাই এ আয়োজন ও প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য।’

সম্মেলনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরো উন্নত করা, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বিদ্যমান সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ নিয়েও মতবিনিময় হয়।

অনুষ্ঠানে ‘ফিকি এফডিআই রিপোর্ট ২০২৬’ প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরো শক্তিশালী করা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে তুলে ধরা হয় বিভিন্ন বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ।

প্রতিবেদনের মূল তথ্য তুলে ধরে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ জানান, নীতিগত সংস্কার ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশে বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ সম্ভব। প্রতিবেদনে তারই একটি স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিনের সঞ্চালনায় সম্মেলনে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির; প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর; প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ; বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি।

সম্মেলনে দেশের শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো স্পন্সর হিসেবে যুক্ত ছিল। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ও রবি আজিয়াটা পিএলসি ছিল প্লাটিনাম স্পন্সর। ডায়মন্ড স্পন্সর হিসেবে ছিল নেসলে বাংলাদেশ পিএলসি, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড ও ইয়ংওয়ান করপোরেশন। গোল্ড স্পন্সর ছিল লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি, ইউনিলিভার বাংলাদেশ, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, গ্রামীণফোন পিএলসি, আইগ্যাস বাংলাদেশ, এবিবি বাংলাদেশ, কোকা-কোলা বাংলাদেশ, সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড এবং ওমেরা এলপিজি। এছাড়া সিলভার স্পন্সর হিসেবে যুক্ত ছিল সিনজেনটা বাংলাদেশ, আরএসজিটি বাংলাদেশ, ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড, মেটলাইফ বাংলাদেশ, সিটি এনএ এবং ফিলিপ মরিস বাংলাদেশ।