বনের কোনো এক নির্জন পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়তে পারে রঙিন ডানার একটি প্রজাপতি। কখনো ফুলের ওপর, কখনো পাতার আড়ালে, আবার কখনো সূর্যের আলোয় ঝলমল করতে করতে উড়ে যায় সে। ক্ষণিকের এ সৌন্দর্য আমাদের চোখে ধরা দিলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির জটিল এক জীবনচক্র। একটি প্রজাপতির জন্ম, বেড়ে ওঠা ও বংশবিস্তারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নির্দিষ্ট কিছু উদ্ভিদ। সে উদ্ভিদ হারিয়ে গেলে একসময় হারিয়ে যেতে পারে প্রজাপতিটিও।
রাঙ্গামাটির কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের রাম পাহাড় ও সীতা পাহাড় এলাকায় পরিচালিত একটি গবেষণা প্রকৃতির এ নিবিড় সম্পর্কের দিকেই নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গবেষণায় নয়টি গোত্রের ৮৭ প্রজাতির প্রজাপতি শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। একই সঙ্গে এসব প্রজাপতির লার্ভার খাদ্য ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পোষক উদ্ভিদ হিসেবে ৪১টি গোত্রের ১০৩ প্রজাতির উদ্ভিদ নথিভুক্ত করেছেন তারা। গবেষণার মূল বার্তা হলো প্রজাপতি রক্ষায় শুধু বনভূমি টিকিয়ে রাখলেই হবে না; তাদের জীবনচক্রের সঙ্গে যুক্ত উদ্ভিদবৈচিত্র্যও সংরক্ষণ করতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. মনোয়ার হোসেন ও গবেষক সেলিনা সুলতানা এ গবেষণা পরিচালনা করেন। ‘চেকলিস্ট অব বাটারফ্লাই লার্ভাল হোস্ট প্লান্টস অ্যান্ড দেয়ার স্পেশাল ডিস্ট্রিবিউশন অ্যাট রাম পাহাড় অ্যান্ড সীতা পাহাড় অব কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্ক বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর এশিয়ান-অস্ট্রেলেশিয়ান জার্নাল অব বায়োসায়েন্স অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়েছে। কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের আটটি নির্ধারিত স্থানে প্রজাপতির লার্ভার পোষক উদ্ভিদ এবং সেগুলোর স্থানভিত্তিক বিস্তৃতি পর্যালোচনা করেছেন গবেষকরা।
প্রজাপতিকে সাধারণত তার রঙিন ডানা, ফুলের ওপর উড়ে বেড়ানো কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। কিন্তু প্রজাপতির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ কাটে পাতার আড়ালে। ডিম থেকে বের হওয়া শূককীট বা লার্ভা পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতিতে রূপ নেয়ার আগে নির্দিষ্ট উদ্ভিদের পাতা খেয়ে বেড়ে ওঠে। অনেক প্রজাতি আবার ডিম পাড়ার জন্যও নির্দিষ্ট পোষক উদ্ভিদ বেছে নেয়। ফলে কোনো বনাঞ্চলে গাছপালা থাকলেই সেখানে সব প্রজাতির প্রজাপতির বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয় না।
কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের গবেষণায় শনাক্ত ১০৩ প্রজাতির পোষক উদ্ভিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৩ প্রজাতি ফ্যাবাসি গোত্রের। তালিকায় রয়েছে আম, জাম, কাজুবাদাম, আতা, আকন্দ, তেঁতুল, বট, সজনে, কাগজি লেবু ও হলুদের মতো পরিচিত উদ্ভিদও। মানুষের খাদ্য, কৃষি কিংবা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত এসব উদ্ভিদের সঙ্গে বনের প্রজাপতির জীবনচক্রের সম্পর্ক রয়েছে।
অর্থাৎ মানুষের কাছে যে গাছ ফল দেয়, ছায়া দেয় কিংবা মসলা ও ওষুধের উপাদান জোগায়, সেই গাছ বা তার কোনো কোনো প্রজাতি প্রজাপতির লার্ভার খাদ্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। উদ্ভিদের এ বহুমুখী ভূমিকা বন সংরক্ষণের প্রচলিত ধারণাকে আরো বিস্তৃত করে। শুধু বড় গাছ কিংবা বনভূমির আয়তন নয়, সেখানে কোন প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে এবং সেগুলো কোন কোন প্রাণীর জীবনধারণে ভূমিকা রাখছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় শনাক্ত ৮৭ প্রজাতির প্রজাপতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৮টি লাইসেনিডি গোত্রের। এছাড়া নিমফালিডি গোত্রের ১৫, প্যাপিলিওনিডি গোত্রের ১১, হেসপেরিডি ও পিয়েরিডি গোত্রের ১০টি করে, ডানাইডি গোত্রের সাতটি এবং স্যাটাইরিডি গোত্রের চারটি প্রজাতি পাওয়া গেছে। আমাথুসিডি ও অ্যাক্রেইডি গোত্রের একটি করে প্রজাতিও শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকরা জানান, প্রজাতিগুলোর এ বৈচিত্র্য কাপ্তাইয়ের বনাঞ্চলে প্রজাপতির উপস্থিতি সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। তবে প্রজাতির তালিকা তৈরি করাই গবেষণার একমাত্র গুরুত্ব নয়। কোন উদ্ভিদের সঙ্গে কোন প্রজাপতির জীবনচক্র যুক্ত, কোথায় এসব উদ্ভিদ পাওয়া যায় এবং তাদের বিস্তৃতি কেমন—এসব তথ্য ভবিষ্যতে সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের আটটি নির্ধারিত স্থানে পোষক উদ্ভিদের প্রজাতি সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পেয়েছেন গবেষকরা। জামাই ছড়ায় সর্বাধিক ৯৭ প্রজাতির পোষক উদ্ভিদ শনাক্ত হয়েছে। শিলছড়িতে পাওয়া গেছে ৯০, ঠাণ্ডাছড়িতে ৮৯ ও বাংছড়িতে ৮৮ প্রজাতি। অন্যদিকে সীতা মন্দির এলাকায় ৮৩, ওয়াগ্গা ছড়ায় ৭৮, বাজার ছড়ায় ৭৫ ও রনির ছড়ায় ৬৭ প্রজাতির পোষক উদ্ভিদ নথিভুক্ত করা হয়েছে।
একই জাতীয় উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে উদ্ভিদের এ ভিন্নতা সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো একটি এলাকায় যে পোষক উদ্ভিদ পাওয়া যায়, অন্য এলাকায় সেটি কম থাকতে পারে কিংবা একেবারেই অনুপস্থিত হতে পারে। ফলে নির্দিষ্ট উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল প্রজাপতির জন্য সব স্থান সমান উপযোগী নাও হতে পারে।
তবে পোষক উদ্ভিদের প্রজাতি সংখ্যা বেশি হলেই কোনো এলাকাকে প্রজাপতির জন্য সবচেয়ে ভালো আবাসস্থল বলা যায় না। উদ্ভিদের বৈচিত্র্য ও প্রজাপতির বৈচিত্র্য এক বিষয় নয়। পোষক উদ্ভিদের প্রাপ্যতার পাশাপাশি আবহাওয়া, ঋতু, ফুলের উপস্থিতি, আলো, আর্দ্রতা এবং অন্যান্য পরিবেশগত উপাদানও প্রজাপতির বিস্তৃতিকে প্রভাবিত করে। তাই কোনো এলাকার প্রকৃত পরিবেশগত গুরুত্ব বুঝতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর পারস্পরিক সম্পর্ককে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রকৃতিতে প্রজাপতির ভূমিকা কেবল সৌন্দর্য ছড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফুল থেকে মধু সংগ্রহের সময় কিছু প্রজাতি পরাগায়নে অবদান রাখে। অন্যদিকে প্রজাপতির ডিম, লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক পতঙ্গ বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এভাবে তারা খাদ্যজাল ও বনজ বাস্তুতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের অংশ হয়ে ওঠে।
প্রজাপতির জীবনচক্রে কোনো একটি পর্যায়ে বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব পুরো প্রজাতির টিকে থাকার ওপর পড়তে পারে। কোনো এলাকায় পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতি দেখা গেলেও সেখানে ডিম পাড়া ও লার্ভার বেড়ে ওঠার উপযোগী উদ্ভিদ পর্যাপ্ত না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে প্রজাতিটির বংশবিস্তার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিপরীতে পোষক উদ্ভিদের উপস্থিতি প্রজাপতির জীবনচক্র সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় একটি শর্ত তৈরি করে, যদিও শুধু উদ্ভিদের উপস্থিতিই টিকে থাকার নিশ্চয়তা দেয় না।
এ কারণে বন সংরক্ষণে শুধু বৃক্ষরোপণের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য বিচার করা যথেষ্ট নয়। কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হচ্ছে, স্থানীয় উদ্ভিদসমাজ কতটা অক্ষুণ্ন থাকছে এবং সেগুলো স্থানীয় প্রাণীর জীবনচক্রে কী ভূমিকা রাখছে—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থানীয় প্রজাতির উদ্ভিদ, গুল্ম ও লতাপাতার উপস্থিতি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বনভূমির সব উদ্ভিদই সব প্রজাতির প্রজাপতির জন্য সমান উপযোগী নয়।
কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের প্রজাপতির বৈচিত্র্য নিয়ে এর আগেও গবেষণা হয়েছে। ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত একটি জরিপে ১০টি গোত্রের ১৪৬ প্রজাতির প্রজাপতি নথিভুক্ত করা হয়েছিল। নতুন গবেষণায় পাওয়া গেছে নয়টি গোত্রের ৮৭ প্রজাতি। দুই গবেষণায় প্রজাতি ও গোত্রের সংখ্যায় এ পার্থক্য থাকলেও শুধু এ সংখ্যা দিয়ে প্রজাপতির বৈচিত্র্য কমে গেছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় না বলে মনে করে গবেষক দল।
এ বিষয়ে অধ্যাপক মো. মনোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগের গবেষণার সঙ্গে বর্তমান গবেষণার তুলনা করতে হলে গবেষণা পদ্ধতি ও নমুনা সংগ্রহের পরিধি বিবেচনায় নিতে হবে। বর্তমান গবেষণায় শুধু প্রজাপতির প্রজাতি শনাক্ত করা হয়নি; কোন কোন উদ্ভিদে তারা ডিম পাড়ে এবং সেসব উদ্ভিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী, সেটিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলে গবেষণার উদ্দেশ্য ও পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণে কিছু প্রজাতি বর্তমান তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নাও হয়ে থাকতে পারে।’
তবে আবাসস্থল ধ্বংস, গাছপালা কমে যাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রজাপতির বৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন এ গবেষক। তিনি বলেন, ‘বনাঞ্চলে মানুষের বসতি স্থাপন, কৃষিকাজ, জুম চাষ ও কাঠ আহরণের প্রবণতা বাড়লে প্রজাপতির আবাসস্থল এবং ডিম পাড়ার উপযোগী গাছপালা ও গুল্মলতা কমে যেতে পারে। বনভূমির পরিবর্তন, বৃক্ষনিধন, আগুন, দূষণ এবং ভূমির ব্যবহার বদলে যাওয়ার মতো বিষয়ও প্রজাপতির আবাসস্থলের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এসব পরিবর্তনে কোনো কোনো পোষক উদ্ভিদের বিস্তৃতি সংকুচিত হলে তার ওপর নির্ভরশীল প্রজাপতির খাদ্য ও প্রজননের সুযোগও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’










