দেশের পাঁচ জেলার মানুষের খাদ্যে নিরাপত্তাহীনতায় বেড়েছে উদ্বেগজনকহারে। একইসঙ্গে বেড়েছে অতিদারিদ্র্যের হারও। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সোমবার (২৪ মার্চ) বিআইডিএস সম্মেলন কক্ষে ‘ক্ষুদ্র এলাকার দারিদ্র্য অনুমান ২০২২: নির্বাচিত জেলাগুলিতে প্রবণতা এবং বৈষম্য, ২০২৪’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনূস। সেখানে ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে বান্দরবন, ঢাকা, খুলনা, রংপুর ও সিলেট জেলায় খাদ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে বলে জানানো হয়েছে।
বিআইডিএস বলছে, ২০২২ সালে পাঁচ জেলায় গুরুত্বতর নিরাপত্তাহীনতায় ছিল শতকরা ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। যেটি ২০২৪ এসে দাড়াঁয় ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশে। এরমধ্যে ২০২২ সালে গ্রামীন পর্যায়ে ছিল ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং শহর অঞ্চলে ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ২০২৪ সালে সেটি বেড়েছে যথাক্রমে ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ ও ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। পাঁচ জেলার মধ্যে খুলনা জেলায় সবচেয়ে বেশী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। ২০২২ সালে এ জেলায় ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ. ২০২৪ এসে সেটি বেড়ে দাড়াঁয় ১২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এছাড়া ২০২২ সালে বান্দরবন জেলায় ছিল ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ঢাকা জেলায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, রংপুর জেলায় ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ ও সিলেট জেলায় ৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
তবে ২০২৪ সালে এসে সব জেলায় বেড়েছে খাদ্যে নিরাপত্তাহীনতা। তারমধ্যে বান্দরবন জেলায় ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ, ঢাকা জেলায় ৫ দশমিক ১ শতাংশ, রংপুরে ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং সিলেটে ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়েছে।
এ দুই বছরে মাঝারি ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতে বেড়েছে এমনটা দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে। মাঝারি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ২০২২ সালে ছিল ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৪ সালে সেটি বেড়ে দাড়িঁয়েছে ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশে। এরমধ্যে ২০২২ সালে গ্রামীন ও শহরে অঞ্চলে ছিল যথাক্রমে ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ ও ৪৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। যা ২০২৪ সালে বেড়েছে ৪২ দশমিক ৩৯ শতাংশ ও ৫৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। জেলা ভিত্তিক মাঝারি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বান্দরবন জেলায়। যেখানে ২০২২ সালে ছিল ৪১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। সেখানে ২০২৪ সালে ৬০ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। সবচেয়ে কম সিলেট জেলায়। যেখানে ২০২২ সালে ছিল ১৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
তবে স্বাভাবিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা কমেছে ২০২৪ সালে।
সংস্থাটি আরো বলছে, ২০২২ সালে পাঁচ জেলায় খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ছিল ৫৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে সেটি কমে ৪৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এরমধ্যে গ্রামীন অঞ্চলে ২০২২ সালে ছিল ৬১ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ছিল ৫২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। শহরে অঞ্চলে ২০২২ সালে ছিল ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে কমেছে ৩৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বান্দরবন জেলা ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে খাদ্য নিরাত্তাহীনতা সবচেয়ে কমেছে। এ জেলায় ২০২২ সালে ছিল ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে সেটি কমে ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাপ্ত অনুমান থেকে জানা যায় ২০২৪ সালে ৪৬.৩ শতাংশ পরিবার মাঝারি স্তরে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হয়েছিল, যেখানে ২০২২ সালে এই হার ছিল ৩৮.০৮ শতাংশ। এছাড়াও, ২০২৪ সালে ৫.৩৬ শতাংশ পরিবার তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হয়েছিল, যেখানে ২০২২ সালে এই হার ছিল ৪.২৯ শতাংশ। এছাড়াও, ২০২৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে অনুমানের তুলনা করলে দেখা যায় যে, নমুনাভুক্ত সমস্ত জেলায় মাঝারি এবং তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বিষয়ে গবেষক মোহাম্মদ ইউনূস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের গবেষণা এলাকায় ২০২২ সালের তুলনায় মাঝারি ও গুরুতর খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। আমাদের ৩১৫০ জনের নমুনা নিয়ে সে তথ্য পেয়েছি। এরমধ্যে তিনটা ভাগে আমরা ভাগ করেছি। প্রথম গুরুতর খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সবচেয়ে বেশী। যেসকল মানুষ মাঝেমাঝে খেতেই পায় না তারা এর অর্ন্তভুক্ত। এছাড়া মাঝারি হচ্ছে মুটামুটি অবস্থা রয়েছে যারা। তাদের সংখ্যাও বেড়েছে। এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তার আওতায় যারা অর্থাঃ যারা প্রয়োজনীয় খাদ্য খেতে পারে তাদের সংখ্যা কমেছে।’এখান থেকে উত্তরণের জন্য তিনি কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘সরকারকে এজন্য উদ্যোগ নিতে হবে। ন্যায্যামূল্যে খাবার সরবরাহ, খাদ্যপণ্য বিতরন ও সরকারিভাবে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি পালন করা যেতে পারে।’গবেষণায় দারিদ্র্যের ও অতিদারিদ্র্যের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে এমনটা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২২ সালে দেশে গরিব ছিল ২৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে তা বেড়ে ২৬ দশমিক ৪৩ শতাংশে পৌঁছেছে। একইসঙ্গে অতিদারিদ্র্য মানুষের সংখ্যা ৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে গ্রামে দরিদ্র মানুষের হার ছিল ২২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা ২৪ দশমিক ১০ শতাংশ। অতিদরিদ্র মানুষের হার ৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ থেকে বেড়ে পাঁচ দশমিক ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে। তারমধ্যে শহরে দারিদ্র মানুষের হার ২৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এছাড়া অতি দারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।
তবে এ প্রতিবেদনে দারিদ্র্য বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি বলে সভায় জানান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের দুই গবেষক। এর কারণ এটি একটি ধারণা-ভিত্তিক গবেষণা।
এ বিষয়ে মোহাম্মদ ইউনূস বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের হাইজহোল্ড ইনকাসম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভের সঙ্গে বিআইডিএসের এই পার্সেপসন সার্ভের তুলনা হবে না। তবে বর্তমানে মানুষের অবস্থা যে খারাপ সেটি আমরা পেয়েছি। যেটি বাস্তবতার সঙ্গে মিল রয়েছে। সেখান থেকে আমি প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেছি।










