বাংলাদেশে সমতল ভূমির জাতিগত সম্প্রদায়ের আদিবাসী মেয়ে শিক্ষার্থীরা এখনো শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে নানান সংকটে রয়েছেন। এর মধ্যে দারিদ্র্য, সাংস্কৃতিক প্রান্তিকতা, লিঙ্গ বৈষম্য এবং অপর্যাপ্ত পরিকাঠামোর মতো বাধাগুলো অন্যতম। ফলে এ জনগোষ্ঠীগুলোর নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চ ঝরে পড়ার হার এবং খারাপ শিক্ষাগত ফলাফল পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক একটি জরিপে।

আজ সোমবার (৯ ডিসেম্বর) ‘আদিবাসীসহ বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মেয়েদের শিক্ষা: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ সব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সভায় গণস্বাক্ষরতা অভিযানের পক্ষ থেকে এ জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়।

জরিপে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বাগদি (বুনো) এবং সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুন্ডা, বুনা, মালো, মাহালি, খোন্দো, বেদিয়া, ভূমিজ, কোলে, তুরি, ভীল, কর্মকার, মাহাতো, মুরিয়ার, মুসোহর, পাহান, পাহাড়িয়া, রাই এবং সিং সম্প্রদায়ের নারী শিক্ষার্থীদের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে।

গণস্বাক্ষরতার যৌথ এ জরিপে দেখা গেছে, আদিবাসী নারী শিক্ষার্থীদের ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। নওগাঁ জেলায় এ হার সর্বোচ্চ, ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং হবিগঞ্জে সর্বনিম্ন, ১৩ দশমিক ১ শতাংশ।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে রাজশাহীতে ৩৩ দশমিক ২৫ শতাংশ, নওগাঁয় ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং গাইবান্ধায় ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে। এছাড়া, রাজশাহীতে ২৪ শতাংশ এবং দিনাজপুরে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে স্কুলে যেতে পারেনি।

জরিপে উঠে এসেছে, বাল্যবিবাহ, গার্হস্থ্য দায়িত্ব, ভাষার প্রতিবন্ধকতা, উচ্চ খরচ, অনিরাপদ পরিবহন এবং অপর্যাপ্ত স্যানিটেশনও শিক্ষার পথে বড় বাধা। শিক্ষাব্যবস্থায় আদিবাসী শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের কম অংশগ্রহণ, বৈষম্যমূলক মনোভাব এবং সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তির অভাব বিষয়গুলোও উল্লেখ করা হয়েছে।

নীতিগত ঘাটতির মধ্যে রয়েছে সরকারি উদ্যোগের অভাব, আদিবাসী ভাষার পাঠ্যপুস্তকের অপ্রতুলতা এবং দারিদ্র্য মোকাবিলার অক্ষমতা। এছাড়া সাংস্কৃতিকভাবে প্রাসঙ্গিক পাঠ্যক্রমের অভাব এবং নারী শিক্ষকের পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিশ্চিত না হওয়াও ঝরে পড়ার একটি কারণ।

সংকটের সমাধান হিসেবে জরিপে সাংস্কৃতিকভাবে প্রাসঙ্গিক শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, সাঁওতাল, ওরাওঁ এবং মাহালির মতো সমতল ভূমির আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে সমস্ত প্রধান আদিবাসী ভাষায় পাঠ্যপুস্তক বিকাশ ও বিতরণ, বোধগম্যতা এবং ব্যস্ততা উন্নত করতে আদিবাসী ভাষা এবং সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষাদান পদ্ধতিতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং নারী শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দরকার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়াও আদিবাসী নারীদের শিক্ষকতা পেশা এবং তাদের সম্প্রদায়ে কাজ করার জন্য বৃত্তি এবং প্রণোদনা প্রদান বৃদ্ধি, নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক উদ্বেগ মোকাবেলা করার জন্য প্রত্যন্ত এবং অনুন্নত এলাকায় মহিলা শিক্ষকদের ন্যায়সঙ্গত বন্টন নিশ্চিতের সুপারিশও জানানো হয়েছে একই জরিপে।

সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. ইউনুছ আলী। তিনি বলেন, এখানে নারী শিক্ষার্থীরাই নয় আদিবাসী গোষ্ঠীর অন্য শিক্ষার্থীরাও সংকটে রয়েছে। এর জন্য তিনি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি না থাকাকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং সরকারি পর্যায়ে আরো বেশি কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী। তিনি আদিবাসীদের 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী' না বলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জরিপ থেকে পাওয়া সুপারিশগুলো সরকারি পর্যায়ে পাঠানো হবে।

এ সময় শুভেচ্ছা বক্তব্য এবং কর্মসূচির উদ্দেশ্য বর্ণনা করেন গণস্বাক্ষরতা অভিযানের উপ-পরিচালক তপন কুমার দাশ। পরবর্তীতে গণস্বাক্ষরতা অভিযানের উপ-পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান গবেষণা ফলাফল তুলে ধরেন।

এছাড়াও অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিসার্চ এন্ড ট্রেনিংয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদৎ হোসেন, আদিবাসী মুক্তি মোর্চার সভাপতি অধ্যাপক যোগেন্দ্র নাথ সরেন এবং বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা।