বিভিন্ন এলাকার সরু গলিতে হাঁটলেই চোখে পড়ে জমে থাকা বৃষ্টির পানি। কোথাও নির্মাণাধীন ভবন। কোথাও খোলা ড্রাম। আবার কোথাও পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা ভাঙা ফুলের টব। এসব জায়গাই এখন এডিস মশার নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্র।

দেশজুড়েও একই চিত্র। কোথাও মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ। কোথাও টানা ভারি বৃষ্টি। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গুর সংক্রমণের ধরনও বদলে যাচ্ছে। আগের হিসাব আর এখন মিলছে না। রোগীর সংখ্যা বাড়ছে আগেভাগেই। সংক্রমণও ছড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন এলাকায়। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দুই বছরের স্থবিরতাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শঙ্কা বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। বণিক বার্তাকে এ গবেষক বলেন, ‘জুনের শেষ থেকেই ডেঙ্গু রোগী বাড়তে শুরু করেছে। জুলাইয়ের প্রতিটি দিনেই রোগীর সংখ্যা আরো বাড়তে থাকবে। আমাদের পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী, আগস্টে ব্যাপক আকারে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা এবং দেশের আরো কয়েকটি অঞ্চলে ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ নিতে পারে।’

ডেঙ্গু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নাগরিকদের সচেতন করা এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব মূলত তাদেরই। কিন্তু দুই বছর ধরে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে সে কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কীটতত্ত্ববিদদের পূর্বাভাস বলছে, চলতি জুলাইয়ে ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা জুনের তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ এবং আগস্টে বাড়তে পারে জুনের তুলনায় তিন-চারগুণ পর্যন্ত। সম্ভাব্য এ সংক্রমণ ঠেকাতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে দেশের সব জেলা শহরে অবিলম্বে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, ‘এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও লার্ভা নিধন কার্যক্রম জোরদার করা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে কমিউনিটির অংশগ্রহণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’

চলতি বছরের শুরুতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ অনেকটাই কম ছিল হাসপাতালগুলোয়। তবে গত জুনে হঠাৎ বাড়তে শুরু করেছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত জানুয়ারি থেকে জুন—এ ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয় ৬ হাজার ১০৪ ডেঙ্গু রোগী। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ভর্তি হয় জুনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, শুধু জুনেই সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯০৭ জন আক্রান্ত হয়েছে, যা বছরের মোট সংক্রমণের ৪৮ শতাংশ। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারায় পাঁচজন। অথচ কেবল জুনেই ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে ডেঙ্গুতে আরো ১৬৩ জন আক্রান্ত হয়েছে ও একজনের মৃত্যুর খবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গতকাল দিয়েছে।

এদিকে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই বেশির ভাগ মেয়র, কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে অপসারণ করে। এরপর দুই বছর ধরে স্থানীয় সরকার প্রশাসক ও নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে চলছে ওইসব এলাকার কার্যক্রম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে স্থানীয় সরকারের এ শূন্যতা ভোগান্তি আরো বাড়াবে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কোনো একক অফিশিয়াল কাজ নয়। শুধু মশার ওষুধ ছিটিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এজন্য প্রয়োজন জনসম্পৃক্ততা। মশা যেন না হয় সেজন্য প্রয়োজন খাল ও জলাশয়গুলো পরিষ্কার ও প্রবহমান রাখা। পাশাপাশি মশককর্মীদের তদারকিও প্রয়োজন। আর এ পুরো প্রক্রিয়ায় লাইনম্যান হিসেবে ভূমিকা রাখেন কাউন্সিলররা। তারা নিজের এলাকার কোথায় কী সমস্যা সে ব্যাপারে ভালো জানেন। কিন্তু দুই বছর ধরে স্থানীয় সরকার স্থবির হয়ে পড়ে রয়েছে। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে শুধু নগর ভবনে বসে মশার ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।’

সরকারের তথ্য বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬৭৫ রোগী পাওয়া গেছে বরিশাল বিভাগে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১ হাজার ১৬৭, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৮৮৮ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৫৪০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ বছর বিশেষ করে ১৬-২৫ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। স্থানীয়সহ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া রোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান দিচ্ছে।

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হতে সাধারণত ৭-১০ দিন সময় লাগে। ফলে জুলাইজুড়ে এডিস মশার ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। জনপ্রতিনিধিরা থাকলে অবশ্য সে পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না বলে মনে করেন তারা।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) যদিও বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য অন্তত অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে ইসি সচিব আব্দুর রহমানেল মাছউদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন যদি অক্টোবর থেকে হয় বা নভেম্বর-ডিসেম্বর যখনই হোক, আমরা কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। অক্টোবরে হলে এর ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে। আমরা মূলত অক্টোবরকে সামনে রেখেই কাজ এগোচ্ছি।’