​স্বাস্থ্য খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্য সহ্য করা হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, একটি সুস্থ ও সবল জাতি ছাড়া দেশের অর্থনীতি বা সামগ্রিক উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আজ আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ব্যবধান কমানো’ শীর্ষক এ মূল্যায়ন কর্মশালায় স্বাস্থ্য খাতে সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

​দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরে ক্ষোভ

বক্তব্যের শুরুতেই মন্ত্রী বিগত সময়ের কেনাকাটায় ব্যাপক দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট কিছু আর্থিক হিসাব তুলে ধরেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই ১১ কোটি টাকার রেডিওথেরাপি মেশিন কেনা হয়েছে ১৮ কোটি টাকায়। এখানে প্রতি মেশিনে ৬ কোটি টাকা পর্যন্ত দুর্নীতি হয়েছে। এমন দুটি মেশিন ফরিদপুর ও খুলনায় পাঠানো হলেও টেকনিশিয়ানের অভাবে তা অব্যবহৃত পড়ে আছে।

​এছাড়া মন্ত্রণালয়ে ফাইল আটকে রেখে ঘুষ দাবির মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও কড়া সমালোচনা করেন তিনি। পিপিআর নিয়ম অনুযায়ী অডিটের জন্য ৫ শতাংশ বা তার বেশি অর্থ রাখার কথা থাকলেও অনেকেই ঠিকাদারদের অনৈতিক সুবিধা দিচ্ছেন বলে মন্ত্রী অভিযোগ করেন।

​হাসপাতালগুলোর ব্যাপক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন

স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নিতে সরকারের বিভিন্ন পরিসংখ্যানভিত্তিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে বর্তমান ৫০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা দুটি ফিজিওথেরাপির সেন্টার স্থাপন করা হবে।

​বড় পরিসরের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের ৮টি বিভাগীয় শহরে বিশেষায়িত ক্যান্সার ইনস্টিটিউট এবং ৫টি শিশু হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। এছাড়া চীনের সহায়তায় দেশে ২০টি নতুন হাসপাতাল স্থাপনের আলোচনা চলছে। এর মধ্যে ২টি হাসপাতাল হবে দেড় হাজার শয্যার এবং বাকি ১৮টি হবে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট। আগামী ১৫ আগস্ট কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং নিউরোসার্জারির নতুন ভবন উদ্বোধনের ঘোষণাও দেন মন্ত্রী। পাশাপাশি শহরাঞ্চলের মানুষের জন্য ১৯২টি আরবান হেলথ সেন্টার বা নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করা হবে বলেও তিনি জানান।

​জনবল সংকট নিরসন ও টিকাদানে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা

স্বাস্থ্য খাতে লোকবলের অভাব পূরণে সরকার দ্রুত ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে ৮০ হাজারই থাকবেন নারী কর্মী। মন্ত্রী বলেন, মা ও শিশু মৃত্যুহার কমাতে এবং প্রসবকালীন স্বাভাবিক সেবা বাড়াতে এই বিপুল সংখ্যক নারী স্বাস্থ্যকর্মী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।

​টিকাদান কর্মসূচির একটি চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবের গরমিলের কারণে হাম-রুবেলার টিকায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। ২ কোটি ৩৫ লাখ শিশুকে টিকার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও দেয়া হয়েছিল মাত্র ১ কোটি ৮৫ লাখ। প্রায় ৪০ লাখ টিকার এ ঘাটতি বুঝতে পেরে সরকার গত ২০ মে কর্মসূচিটি স্থগিত করে। পরে নিজস্ব উদ্যোগে দ্রুত টিকা কিনে আগামী সেপ্টেম্বরের শেষে বা অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ঘাটতি পূরণে নতুন কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দেন তিনি।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের (এইচইইউ) মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হকের সভাপতিত্বে কর্মশালায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গবেষক ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।