পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের করণীয় এবং ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের লক্ষ্য নিয়ে রাজধানীতে শুরু হয়েছে দুদিনব্যাপী ‘বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৬’ (বিডিসি ২০২৬)। ‘বাংলাদেশ ও পরিবর্তনশীল বিশ্ব: অজানা সময়, উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থা এবং সহমর্মিতার রাজনীতি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ কনফারেন্সে দেশ-বিদেশের নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও কূটনীতিকরা অংশ নিয়েছেন। আলোচ্যসূচিতে রয়েছে অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও জলবায়ু ইস্যু।

রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে দ্বিতীয়বারের মতো এ কনফারেন্স আয়োজন করেছে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইটিকস (দায়রা)।

আজ সকালে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বর্তমান সরকার ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা একটি রেইনবো নেশন বা বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই দর্শন থেকেই আমাদের দল সাঁওতাল, মারমা ও চাকমাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সংসদে মনোনীত করেছে।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথি ছিলেন মালদ্বীপের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ জিহাদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যকার গভীর কাঠামোগত পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে মালদ্বীপে প্রায় এক লাখ থেকে এক লাখ ৩৫ হাজার বাংলাদেশী অভিবাসী কাজ করছেন, যারা উভয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে আমাদের শ্রমবাজারের সুরক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। একইসঙ্গে অর্থনৈতিক নীতিকে কেবলমাত্র প্রযুক্তিগত হিসাব হিসেবে না দেখে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।

অধিবেশনের বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি বলেন, নতুন বিশ্বব্যবস্থা কেবল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেই আবির্ভূত হচ্ছে না, বরং উৎপাদন, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ এবং স্বয়ং জ্ঞানের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আমাদের শিক্ষণ পদ্ধতি, গবেষণা, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়াকে বদলে দিচ্ছে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল নতুন করে সাজানো হচ্ছে, শক্তি ও জ্বালানি ব্যবস্থা চাপের মুখে রয়েছে এবং প্রচলিত পেশাগুলো পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন শিল্পের জন্ম হচ্ছে। এক্ষেত্রৈ অ্যাকাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রি—উভয়েরই একে অপরকে প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেন, এ সম্পর্ক হতে হবে চিন্তাশীল, নৈতিক এবং দীর্ঘমেয়াদি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত শিল্পের বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে তাদের সঙ্গে কাজ করা, প্রয়োগমূলক গবেষণা করা এবং পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা। অন্যদিকে, শিল্প খাতের উচিত গবেষণা ও উন্নয়নে সহায়তা করা, শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থবহ সুযোগ তৈরি করা, প্রয়োজনীয় তথ্য ভাগাভাগি এবং মানসিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলো বুঝতে গবেষকদের যুক্ত করা। তবে এ অংশীদারত্ব যেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল বাণিজ্যিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ, পরিবেশগত প্রভাব, জননিরাপত্তা, বৈষম্য এবং প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার সম্পর্কে কঠিন প্রশ্ন তোলার পূর্ণ স্বাধীনতা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর থাকতে হবে। প্রকৃত সহযোগিতা কেবল শিল্পের বাস্তব জ্ঞানকেই সম্মান করে না, বরং শিক্ষাঙ্গনের স্বাধীন বিচারবুদ্ধিকেও মূল্যায়ন করে।

উদ্বোধনী অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (সোয়াস) অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক খান। তিনি বলেন, বিশ্বব্যবস্থায় এত বড় সংকট আমরা আর কখনো দেখিনি। বিশ্বব্যবস্থার নিয়মকানুন শক্তিগুলোর দ্বারাই ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আমাদেরকে তার পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে। পুরনো বিশ্বব্যবস্থা আর অবশিষ্ট নেই, এখন এক নতুন আন্তর্জাতিক রূপরেখা তৈরি করতে হবে। আমরা হয়তো একটি বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা অনেকেই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করলেও হয়তো প্রকাশ্যে কথা বলতে চাই না। কিন্তু বিশ্বজুড়ে এমন কিছু সংকট চলছে যার সহজ কোনো সমাধান নেই।

‘সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিই আজ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, বাংলাদেশও এর বাইরে নয়’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশকেও কর্মসংস্থান তৈরি এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মতো সংকটের মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি ১৭ বছরের চরম স্বৈরাচার ও দুর্নীতির রেখে যাওয়া দায়ভারও আমাদের বহন করতে হচ্ছে। সে দুঃশাসন আমাদের জন্য এমন এক ব্যাংকিং খাত রেখে গেছে, যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ ঋণই এখন খেলাপি। এর অর্থ হলো ওই অর্থ হয়তো আর কখনোই ফেরত পাওয়া যাবে না। বিদ্যুৎ খাতে বিদায়ী সরকারের অনুগতদের সুবিধা দেয়ার জন্য চুক্তি করা হয়েছিল, এর ফলে প্রতিযোগীদের তুলনায় আমাদের বিদ্যুতের বাস্তব মূল্য দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সরকার প্রতি বছর বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে বলেই খাতটি কোনোমতে টিকে আছে, কিন্তু এই ভর্তুকি দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়।

দুদিনের এ সম্মেলনে ১৯টি প্যানেল আলোচনা, ৭টি কি-নোট স্পিচ, ৬টি পেপার প্রেজেন্টেশন, একটি করে গোলটেবিল আলোচনা ও ফায়ারসাইড অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। এসব আয়োজনে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নীতি-নির্ধারক, লেখক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, আমলা, কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ, ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।